লেখায় ------ আ স ম আহসান উল্লাহ আব্দুল্লাহ
জীবনের স্রোতোধারার অনিবার্য সঙ্গী হলো মানবজাতি ৷ 'নর' এবং 'নারী' মানবজাতির এই জীবনধারাকে প্রবাহমান গতি দিয়েছে সেই সৃষ্টির আদি মানব আদমের যুগ থেকে ৷ বর্তমান বিশ্বের ৬১০ কোটি মানুষ যুগ-যুগান্তের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার এখন ৷ মানুষ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ একটি বক্তব্য প্রায় সবারই জানা, তাহলো-‘মানুষ হলো বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণী' ৷ সত্যিই এই বিচারবোধই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তুলেছে ৷ সেজন্যে মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মত জীবন যাপন না করে আল্লাহ প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গড়ে তুলেছে একটি সুশৃঙ্খল সামাজিক ও পারিবারিক জীবন ৷
যুগে যুগে আল্লাহ প্রেরিত রাসূলগণই এই পরিবার
গঠনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন ৷ সুশৃঙ্খল এই পারিবারিক কাঠামো থেকেই মানুষ
পেয়েছে সভ্যতার আলো ৷ পরিবার কাঠামোর সাথে সভ্যতা যেন নিত্যসঙ্গী ৷ যেখানে
পরিবার কাঠামো নেই, সেখানে সভ্যতা বলতে যা বোঝায়, তার সাথে অন্যান্য
প্রাণীকূলের জীবনযাপন পদ্ধতির খুব বেশী পার্থক্য নেই ৷ নারী এবং পুরুষ
উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে পরিবার ৷
এই 'সম্মিলিত' শব্দের মধ্যেই
নিহিত রয়েছে নারী-পুরুষের পারস্পরিক অবদান এবং অধিকারের সূক্ষ্ম বিষয় ৷
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই নারী-পুরুষের অধিকার এবং পারস্পরিক সম্পর্কের
ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শগত মতবাদ বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ করেছে ৷
সেসব দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী একমাত্র ইসলাম ব্যতীত অন্য সকল ধর্ম ও মতবাদই
নারীকে কখনো ভোগ্যপণ্যে কিংবা কখনো পুরুষ দেবতার সেবাদাসীতে পরিণত করেছে ৷
সভ্যতার এই স্বর্ণযুগেও নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অধিকার নিয়ে
এখনো চলছে বিচিত্র কৌণিক মতামত ৷
পশ্চিমা সমাজে পরিবার কাঠামো ভেঙ্গে পড়ায় সেখানে বিবাহ-বহির্ভূত লিভিং টুগেদার বা নারী-পুরুষের একত্রবাস প্রথা চালু রয়েছে ৷ এছাড়া বিয়ের প্রচলন সেখানে যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, তাতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার প্রশ্নে মতবিরোধের জের ধরে ডিভোর্সের মাত্রাই ব্যাপক ৷ যে সমাজে লিভ-টুগেদারের জন্যে বিয়েরই প্রয়োজন নেই, সে সমাজে ডিভোর্স বা তালাক প্রদানের মাত্রা যে কতো মামুলি ও ভয়াবহ, তা খুব সহজেই অনুমান করা যায় ৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানে বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মানদন্ডে পশ্চিমা জগত আধুনিক সভ্যতার দাবীদার হলেও ক্ষয়িষ্ণু পরিবার কাঠামোর ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতা বিশ্বব্যাপী অকল্যাণই বয়ে এনেছে ৷
তাদের ঐ কু-সংস্কৃতির
ব্যাপক প্রভাবে মুসলিম জাতির মধ্যেও তা এখন সংক্রমিত হচ্ছে ৷ এরফলে
পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ব্যাপক বেড়ে গেছে ৷ অথচ পরিবারের প্রধান যে দুটি
স্তম্ভ অর্থাৎ বাবা-মা বা স্বামী-স্ত্রী-তাদের মধ্যে যদি পারস্পরিক
কর্তব্যবোধ স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকতো, তাহলে এই সমস্যা হয়তো দেখাই দিত না ৷
বহু শিক্ষিত পরিবারেও যথার্থ ইসলামী শিক্ষার অভাবে এ ধরণের সমস্যা বিরাজ
করছে ৷ শিক্ষিত এইসব পরিবার তাদের পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে চিন্তা করে
থাকে পাশ্চাত্যের মানদন্ডে, যেখানে নারী-পুরুষ স্বাধীনভাবে যাপন করছে পশুর
মত জীবন ৷ তাই মুসলিম দম্পতিদের উচিৎ তাদের নিজস্ব ধর্মাদর্শ সম্পর্কে
সচেতন হয়ে পারস্পরিক কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া এবং যথাযথভাবে তা মেনে চলা
৷ তাহলেই দেখা যাবে সংসার হয়ে উঠেছে শান্তির সোনালী নীড়।
একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, স্বামী-স্ত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন এবং পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামই সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ স্থাপন করেছে ৷ ইসলাম পূর্বকালে নারীকে মানুষই মনে করা হতো না ৷ গ্রীকরা তাদেরকে মনে করতো শয়তানের চর ৷ জৈবিক চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনেই তাদের ব্যবহার করা হতো ৷ রোমানদের অবস্থাও ছিল তাই ৷ সেখানে কন্যাসন্তানকে বিক্রি করা হতো ৷ জাহেলিয়াতের যুগে আরবে কন্যাসন্তানকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার ইতিহাস সর্বজনবিদিত ৷ পারস্য সভ্যতায়ও কন্যাসন্তানকে ভীষণরকম অকল্যাণকর বলে মনে করা হতো ৷ চীনের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, কোন পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম হলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনরা দুঃখ ও সহানুভূতি জানাতো ৷ অর্থাৎ নারী ছিল একটা ভোগ্যপণ্য ৷ তাদের ব্যক্তিগত কোন মানবিক সত্ত্বাই স্বীকার হতো না ৷
আর হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা মৃত ব্যক্তির সাথে তার
স্ত্রীকেও জীবন্ত পুড়ে মারতো ৷ এরকম করুণ একটা ঘটনাকে তারা স্বামীর প্রতি
স্ত্রীর ভালোবাসা ও ত্যাগের নিদর্শন বলে মনে করতো ৷ কী আশ্চর্য, বিধবাকে
সম্পত্তির অধিকার না দিয়ে, দিয়েছিল চিতার আগুনে জীবন্ত পোড়াবার নির্দেশ !
এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র উপায়ে নারীদের সত্ত্বাকে লাঞ্চিত
করা হয়েছিল ৷ ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের ফলে নারী পেল তার মৌলিক মানবিক
অধিকার ।
নবী করিম (সাঃ) ঘোষণা করেন, হে মুসলমানেরা! তোমাদের উপর তোমাদের
স্ত্রীদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের উপরও তোমাদের অধিকার রয়েছে ৷"
আল্লাহ রাববুল আলামীন বললেন, নারীরা তোমাদের পোষাক এবং পুরুষরাও নারীদের
পোষাকস্বরূপ ৷ যুগান্তকারী এইসব ঘোষণার মাধ্যমে নারী ফিরে পেল তাদের
অধিকার, ফিরে পেল মানুষ হিসাবে তাদের অস্তিত্ব, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে
তারাও হয়ে উঠলো সভ্যতা সৃষ্টির প্রশংসিত স্রষ্টাদের গর্বিত অংশীদার ৷ কবি
নজরুলের ভাষায়- পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে
নারী, অর্ধেক তার নর।
ইসলাম
নারী এবং পুরুষকে তাদের পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি
পরিবারের শৃঙ্খলা বিধানের জন্যে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে একটা আদর্শ
সমাজ বিনির্মানকে সুনিশ্চিত করেছে ৷ পরিবারের মূল হলো স্বামী-স্ত্রী বা
বাবা-মা৷ স্বামী-স্ত্রীর জীবনে শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অনুশীলন যদি না থাকে,
তাহলে তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনেও তা আশা করা যায় না ৷ আর
স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের বংশধরের সামষ্টিক রূপই হলো সমাজ ৷ আর সমাজ
কাঠামোর বৃহত্তর সংগঠনই রাষ্ট্র ৷ তাই বলা যায় একটা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও
আদর্শের মূল ভিত্তিই হলো পরিবার ৷ ইসলাম তাই পরিবার তথা বাবা-মা এবং তাদের
সন্তানদের মধ্যকার পারস্পরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিধানে স্বামী-স্ত্রীর
মধ্যে একের প্রতি অপরের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন সম্পর্কে যথাযথ রূপরেখা
দিয়ে দিয়েছে ৷ কারণ স্বামী-স্ত্রীর সুদৃঢ় বন্ধনই উত্তর প্রজন্মের নৈতিক
শৃঙ্খলা বিধানের একমাত্র উপায় ৷
সমাজের প্রতি একটু সচেতন দৃষ্টি দিলে
লক্ষ্য করা যাবে, যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ রয়েছে, সে
পরিবারে শান্তিতো নেই-ই বরং পরবর্তী প্রজন্মও বিশৃঙখল জীবন যাপনে অভ্যস্থ
হয়ে পড়ে ৷ সামাজিক অনাচার, মাদকাশক্তিসহ মানবিক মূল্যবোধ বর্জিত
কর্মকান্ডের মূলে রয়েছে এই পারিবারিক বিশৃঙ্খলা ৷ অথচ পরিবারে এ ধরনের
বিশৃঙ্খলা সাধারণত খুবই ছোটখাট ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধে ওঠে ৷
ঘটনাগুলোর জন্য পারস্পরিক অহমবোধ, অশ্রদ্ধা, সম্মানহীনতা এবং নিজ নিজ
কর্তব্যের ব্যাপারে ইসলামের বেধে দেয়া মানদন্ড সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা না
থাকাই দায়ী ৷ আমাদের সমাজে এখনও অজ্ঞানতাবশত স্বামীদের অনেকেই মনে করেন
যে, স্ত্রী হলেন তাদের দাসীর মতো ৷ স্ত্রীর কাজ হলো স্বামীর সকল আদেশ মেনে
চলা ৷
খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন স্ত্রী এ ধরনের স্বৈরাচারী স্বামীর
কর্তৃত্ব মেনে নেয় না ৷ সেজন্যেই শুরু হয় দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ৷ স্বামীরা
তাদের স্ত্রীদের ওপর যেরকম অধিকার চর্চা করার চেষ্টা চালায়, স্ত্রীদেরও যে
স্বামীর ওপর সেরকম আধিকার চর্চার সুযোগ রয়েছে এ কথাটা স্বামীরা ভুলে যান
এবং পুরুষতান্ত্রীক স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেন ৷
একজন পুরুষ
ইসলামের এই নীতিমালার মানদন্ডে নিজেকে বিচার করবেন এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা ও
দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন এটাই প্রত্যাশা ৷
প্রতিটি
পরিবারকে সুখ-শান্তির সোনালী নীড়ে পরিণত করার সুমহান লক্ষ্য অর্জন করার
জন্যে যেসব দিক-নির্দেশনা আল্লাহ রাববুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রাসূল
দিয়েছেন, সেগুলোর প্রতি যথার্থ মনোযোগী হওয়া একান্ত জরুরী ৷ পরিবারের
সূচনা হয় বিয়ের মধ্য দিয়ে ৷ বিয়ের মাধ্যমেই নর এবং নারীর দুটি জীবন একটি
মাত্র স্রোতে প্রবাহিত ৷ বাংলায় একটি প্রবাদ আছে,তেলে-জলে কখনো মেশে না ৷
অর্থাৎ মিলন ঘটে না ৷ তাই দেখা যায় বিপর্যয় ৷ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও যদি
তেল আর জলের মতো হয়, তাহলে পারিবারিক বিপর্যয় দেখা দেবে-এটাই স্বাভাবিক ৷ ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায় নর-নারী বাছাই কীভাবে করতে হবে ? অধিকার বা কর্তব্য
সম্পর্কে কথা বলার আগে আমরা বরং এ প্রশ্নটির সমাধান করার চেষ্টা করি ৷
বিয়ের
ক্ষেত্রে কনের চারটি গুনের কথা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ এগুলো হলো-
ঐশ্বর্য, আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারিত্ব ৷ ইমাম রেজা (আঃ) বলেছেন, একজন
পুরুষের জন্যে সবচেয়ে বড়ো সম্পদ হলো ঈমানদার নারী পাওয়া, যে নারী সেই
পুরুষটিকে দেখামাত্রই সুখী হয়ে উঠবে এবং তার অবর্তমানে তার সম্পদ ও সম্মান
রক্ষা করবে ৷" নারীর যে চারটি গুনের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে
দ্বীনদারিত্বই হলো প্রধান বিষয় ৷ কারণ দ্বীনদার রমনীর কাছে অন্য তিনটি
গুনের মূল্য অপ্রধান ৷ কেননা দ্বীনদার নারী ঐশ্বর্য, আভিজাত্য কিংবা
সৌন্দর্যের বড়াই করে না ৷ ধন-সম্পদ এবং বংশগত সাম্য না থাকলে খুবই সমস্যা
দেখা দেয় ৷
স্বামী বেশী ধনী হলে স্ত্রীকে ছোটলোক বলে খোটা দেয়ার আশঙ্কা
থাকে ৷ পক্ষান্তরে স্ত্রীর বাবা-মা তুলনামূলকভাবে ধনী হলে স্বামীকে ছোটলোক
বা বিভিন্নভাবে খোটা দেয়ার আশঙ্কা থাকে ৷ বিশেষ করে জীবন-যাপন প্রণালীতে
তারতম্যের সম্ভাবনা থাকে ৷ আর এসব থেকেই পারিবারিক সমস্যা সাধারণত দেখা
দেয় ৷ আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলো এই চারটি বিষয়ে সমতা থাকলেও
বর-কনের পারস্পরিক পছন্দের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে; কোনভাবেই
জোর-জবরদস্তি করা যাবে না ৷ জোর করে বিয়ে করা বা দেয়া হলে পরিণতি কখনোই
ইতিবাচক হয় না ৷
এই মৌলিক বিষয়গুলো মনে রেখে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রীর
যে দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এবং স্বামীর
প্রতি স্ত্রীর কর্তব্যগুলো আন্তরিকভাবে পালন করা সুখ-শান্তির অনিবার্য শর্ত
৷
একটি
পরিবারের স্তম্ভ হলো দুটি ৷ নারী-পুরুষ তথা স্বামী ও স্ত্রী ৷ এ দুজনের
মধ্যে যে কোন একজনকে পরিবারের অভিভাবকত্ব নিতে হয় ৷ অভিভাবক শূন্য পরিবার
বিশৃঙখল ৷ পরিবার সংগঠনটির সাথে ঘরে-বাইরের বহু বিষয়ের সম্পর্ক থাকে ৷
তাছাড়া নারীর তুলনায় পুরুষ যেহেতু কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিকভাবেই
শক্তিমান, তাই আল্লাহ রাববুল আলামীন পুরুষকেই স্ত্রী তথা পরিবারের অভিভাবক
হিসাবে ঘোষণা করেছেন ৷ বলেছেন, 'পুরুষরা হলো স্ত্রীদের অভিভাবক এবং
ভরণপোষণকারী ৷' অন্যদিকে রাসূলে খোদা (সাঃ)বলেছেন, 'পুরুষ হলো পরিবারের
প্রধান, আর যারা প্রধান তাদের কর্তব্য হলো নিজ নিজ অধীনস্থদের প্রতি
দায়িত্বশীল হওয়া ৷'
তো কোরআণ এবং হাদীস অনুযায়ী পরিবারের অভিভাবকত্ব যেহেতু পুরুষ তথা স্বামীর ওপর ন্যস্ত হয়েছে, তাই স্বামী অর্থাৎ পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব এবং কর্তব্যও অনেক বেশী ৷ পুরুষ কর্তাটিকে তাই হতে হয় পরিবারের প্রধান শৃঙ্খলা বিধায়ক ৷ যে পরিবারে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়, সেখানেই বিপর্যয় নেমে আসে ৷ তবে এখানে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তাহলো পরিবারের কর্তা বলে সে যেন অন্যান্যদেরকে তার প্রজা ভেবে না বসে বরং পারস্পরিক পরামর্শ, আন্তরিকতা ও দুরদর্শিতার সাথে শ্রদ্ধা-সম্মান ও স্নেহের ভিত্তিতে একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য ৷ স্ত্রী যেহেতু পরিবার সংগঠনে স্বামীর প্রধান সহযোগী এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিধানের প্রধান ব্যক্তি, সেজন্যে স্ত্রীর ওপর স্বামীর যথাযথ দায়িত্ব পালনই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৷ একথা সর্বজনবিদিত সত্য যে, দীর্ঘ পথ চলতে গেলে মাঝখানে ছোট-খাটো সমস্যা অর্থাৎ হোঁচট খাওয়ার একটা আশঙ্কা থেকে যেতেই পারে ৷ আর যেখানে ব্যক্তি এবং ব্যক্তিত্বের সহাবস্থান ঘটে এবং তা যদি স্বামী-স্ত্রীর মতো দুটি ব্যক্তিত্বের দীর্ঘ সংসার জীবনের পথ পাড়ি দেয়ার মতো ঘটনা হয়, তাহলে ছোট-খাটো যে কোন ধরণের সমস্যা দেখা দেয়াটা অসম্ভব কিছু নয় ৷
আর সমস্যা দেখা দিলে দোষ কার তা না
খুঁজে বরং কীভাবে তার সমাধান করা যায়, তারই প্রচেষ্টা চালানো উচিৎ ৷ কারণ
মানুষের প্রকৃতিগত মানবীয় দুর্বলতার কারণেই দোষ-ত্রুটি হয়ে থাকে ৷ ফলে
দোষ-ত্রুটি খুঁজতে গেলে অযথা বিড়ম্বনাই বাড়বে ৷ সেক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করাই
হবে বুদ্ধিমানের কাজ ৷ সমস্যা সমাধানের পর দোষ যদি স্ত্রীরও হয়ে থাকে, তবু
তাকে তিরস্কৃত করা যাবে না ৷
কারণ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন,
'কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারীকে ঘৃণা না করে ।' স্ত্রীরতো দোষ
থাকতেই পারে ৷ তাই বলে কি তার কোন গুণ নেই ? যদি গুণ থেকেই থাকে,
সেক্ষেত্রে গুণগুলোকে সামান্য তুলে ধরে দোষকে চেপে যাওয়াটাই হবে
অভিভাবকসুলভ আচরণ ৷ আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন, 'তোমরা
স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণ কর ৷ তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তাহলে অসম্ভব
নয় যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে অনেক কিছুই ভালো ও কল্যাণ জমা করে রেখেছেন ৷'
স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশিত আচরণবিধি অনুযায়ী অবশ্যই সহিষ্ণুতার
পরিচয় দিতে হবে ৷ মনে রাখতে হবে মহানুভবতার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে, আর
অসহিষ্ণুতার মধ্যে রয়েছে সমূহ বিপর্যয় ৷
স্বামীকে
হতে হবে প্রেমিক ৷ প্রেমের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে স্ত্রীর সাথে নীবিড়
সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে ৷ প্রত্যেক স্ত্রীই চায় তার স্বামী তাকে একান্তভাবে
ভালোবাসুক ৷ কিন্তু ভালোবাসার জন্যে স্ত্রীরা সাধারণত মুখ খোলে না ৷
সেজন্যে স্বামীর ওপর একটা গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয় স্ত্রীকে আবিস্কার করার ৷
প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিগত ভালো লাগা, মন্দ লাগার ব্যাপার থাকে ৷
স্ত্রীর প্রিয় বিষয়গুলোকে অর্থাৎ সে কী পছন্দ করে, কী অপছন্দ করে-সে
বিষয়গুলো মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করতে হবে ৷ তার চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারগুলোর
প্রতিও একইভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে ৷ এগুলো আবিষ্কার করার পর ন্যায় সঙ্গত
চাওয়া-পাওয়া ও অধিকারগুলো পূরণের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে ৷
স্বামী তার
আচার-আচরণ, ভাবভঙ্গী দিয়ে স্ত্রীকে যদি বোঝাতে পারে তাহলে স্বামীর প্রতি
স্ত্রীও আকৃষ্ট হবে এবং সেও তার ভালোবাসা উজাড় করে দেবে ৷ আর স্বামীকে যদি
তার স্ত্রী ভালোবাসে তাহলে তার সংসার গোছাতেও আন্তরিক হবে ৷ নারী জাতি
স্বভাবতই স্নেহ, আদর, ভালোবাসা প্রত্যাশা করে৷ যতোই সে স্নেহ আর আদর পায়,
ততোই সে সুন্দর হয়ে ওঠে ৷ নারী এমন এক আবেগপ্রবণ চরিত্র যে, স্নেহ আর আদর
পাওয়ার জন্যে এবং সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠার জন্য সে অনেক কিছু ত্যাগ করতেও
দ্বিধা করে না ৷ ছোট বেলা থেকে যে মেয়েটি বাবা-মায়ের আদর-স্নেহ পেয়ে বড়ো
হলো, সে মেয়েটি যখন বিয়ে করে স্বামীর কাছে আসে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে চায়
স্নেহ ভালোবাসার সকল আকাঙ্ক্ষা তার কাছ থেকেই পূরণ করতে ৷
বাবা-মা,
ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে এতোদিন যতো ভালোবাসা
পেয়েছিল সে, স্ত্রী হয়ে স্বামীর কাছে যাবার পর স্বামীর কাছ থেকেই তা পেতে
চায় ৷ ফলে কতোবেশী পরিমাণ ভালোবাসা একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে
প্রত্যাশা করে তা একবার ভেবে দেখুন ৷ আর স্ত্রীর তা প্রাপ্য, কারণ স্ত্রী
তার নিকটজনদের ছেড়ে একমাত্র স্বামীর কাছে চূড়ান্ত আস্থা নিয়ে এসেছে ৷ তার
এই ত্যাগকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা খুবই জরুরী ৷ নবী করিম (সাঃ) বলেছেন,
'যে ব্যক্তি স্ত্রীকে বলে আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি' এই কথাটা তার
স্ত্রীর মন থেকে কখনোই মুছে যায় না ৷ এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, স্ত্রীকে
মনে মনে ভালোবাসলে চলবে না, ভালোবাসার কথা মুখেও প্রকাশ করতে হবে এবং
ভালোবাসা হতে হবে আন্তরিক ও অকৃত্রিম ৷ স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে অবস্থান করলে
নিয়মিত খোঁজ-খবর নেয়া উচিত ৷ কাজের ফাঁকে অফিস থেকে ফোন করে কথা বললে
স্ত্রীর নিঃসঙ্গতা কাটে ৷
বিদেশ-বিভূঁয়ে বাস করলে চিঠিপত্র লেখা যেতে পারে
৷ ফোন করে অভাব-অনুভূতির কথা প্রকাশ করলে দূরত্ব সত্ত্বেও আন্তরিকতা
বৃদ্ধি পায় ৷ যেখানেই আপনি বেড়াতে যান না কেন, বৌ-এর জন্য ছোট-খাটো করে
হলেও উপহার সামগ্রী কিনে এনে তার হাতে দিলে স্ত্রী বুঝবে যে, স্বামী তাকে
ভুলেনি ৷ সামান্য উপহার সামগ্রী ভালোবাসার অকৃত্রিম নিদর্শন হয়ে উঠবে ৷
বিনিময়ে স্ত্রীর অমূল্য ভালোবাসায় ধন্য হবে স্বামীর জীবন, পুষ্পিত হয়ে
উঠবে সংসার তথা দাম্পত্য জীবন ৷
পরিবারের
সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার প্রধান উপায় হলো স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক বা দৃঢ়
বন্ধন গড়ে তোলা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই বন্ধন ঠিক গড়ে উঠছে না।
এর কিছু কারণ আমরা গত কয়েকটি পর্বে তুলে ধরেছি। এবারের পর্বে আরো কিছু
বিষয় নিয়ে আলোচন করব।
"ছেলেটা
শেষ পর্যন্ত গোল্লায় গেল। পড়ালেখা কিছুই হচ্ছে না। খালি খেলাখুলা খালি
খেলাধুলা। হবে কোত্থেকে! যা একখানা স্কুল, তার আবার মাষ্টার। ছাগলকে ঘাষ
খাওয়ায় আর ছেলেদের নামতা শেখায়। ছাগলগুলোও যা, যখনি দেখি খালি পেট, যেন এই
দেশে ঘাস-টাস নেই। ঘাস থাকবেই বা কোত্থেকে। এখনকি আর অত খালি জায়গা আছে
যে ঘাস জন্মাবে। যেখানে-সেখানে বাড়ি-ঘর উঠছে আর উঠছে। না উঠেই বা কি হবে!
যেভাবে জন্ম নিচ্ছে পোলাপান! আজব এক দেশ! জায়গার চেয়ে মানুষ বেশী, এতবেশী
সুনামী হইলো কিন্তু কোন কমতি নেই।"
এভাবে
অভিযোগের নামতা পড়তে পড়তে লোকটি বাসায় এসে বৌকে বলতে শুরু করলো, "তোমার
পোলাপানের কী খবর! খবর টবর কিছু রাখো! রাখবে কোত্থেকে, তোমার কি আর সংসারের
চিন্তা আছে! যেন সংসারটাতো আমার একার! তোমারতো খালি বাপের বাড়ীর
চিন্তা....."
পৃথিবীতে
এমন মানুষ সত্যিই বিরল যে তার নিজের অবস্থা নিয়ে পরিপূর্ণ সুখী। তারপরও
কেউ কেউ নিজের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে সুখেই আছে, কারণ এর কষ্টের কথা মনের গভীরে
গোপন করে রাখার চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে কিছু কিছু লোক আছে, যারা এতো
দুর্বলচিত্ত যে দুঃখ-কষ্ট বা সমস্যার কথা গোপন রাখতে পারে না। কাউকে পেলেই
অভিযোগের সুরে বলতে শুরু করে দেয়। এ ধরণের লোকেরা পৃথিবীর সকল ব্যাপারেই
অভিযোগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের অভিযোগ থেকে কেউই আর বাদ পড়ে না।
বন্ধু-বান্ধব কাউকে পেলেই শুরু হয়ে যায় অভিযোগ চর্চা। এ পর্বের শুরুতেই
আপনারা যে ঘটনাটি জেনেছেন, তা-ই এর প্রমাণ। এরা ধীরে ধীরে বন্ধু-বান্ধবহীন
হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিবার-পরিজন ও সন্তানরা এই অভিযোগকারীর কথা চোখ-কান
বুঁজে শুনে যেতে বাধ্য হয়। তাদের আর কিছুই করার উপায় থাকে না। ভেতরে ভেতরে
তাই অসহ্য ও বিরক্ত হয়ে পড়ে। বিপজ্জনক বিষয়টি হলো পরিবারের খুঁটিনাটি
ব্যাপারেও এরা অভিযোগপ্রবণ হয়ে ওঠে। পরিবারের সবাই তাই অভিযোগ আতঙ্কে
ভুগতে থাকে।
অভিযোগের
ব্যাপারটি একচেটিয়া যদি হয়, তাহলে হয়তো সমস্যা হয় না। কিন্তু যখনি অপর
পক্ষ থেকে প্রতিবাদ আসে তখনি দেখা দেয় বিপর্যয়। এই বিপর্যয় পরিবারেরও
বিপর্যয় ডেকে আনে। অথচ ইসলাম অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকাকে উত্তম আচরণ বলে
মনে করে। কেউ কোন বিপদে পড়লে অন্যের কাছে অভিযোগ না করে আল্লাহর দরবারেই
সকল সমস্যা সমাধানের জন্যে প্রার্থনা করা উচিত। কারণ আল্লাহই সকল কিছু
সমাধানের মালিক।
মনে
রাখবেন, আপনার স্ত্রী বাইরের বিভিন্ন ঝামেলা বা অভিযোগের কথা শুনতে চায় না
আপনার কাছ থেকে, সে অন্য কিছু আশা করে। আপনি তার ইচ্ছা-আকাঙ্খাগুলোর প্রতি
শ্রদ্ধা দেখিয়ে এইসব বাজে প্রবণতা ত্যাগ করার চেষ্টা করুন । বাড়ি ফিরে
বাইরের দুনিয়ার সব সমস্যার কথা ভুলে যান। পরিবারের সাথে সুখে-শান্তিতে
সময়টা পার করার চেষ্টা করুন । হাসি-আনন্দে ভরে তুলুন সময়টাকে। পরস্পরের
সান্নিধ্য উপভোগ করার চেষ্টা করুন। একসাথে খেতে বসুন, হাস্যালাপ করুন।
আপনার স্ত্রীর রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন। ছেলেমেয়েদের সময় দিন। তবেই গড়ে
উঠবে সোনালী নীড়।
কিছু কিছু
মানুষ আছে খিটখিটে মেজাজের। তারা খালি দোষ খুঁজে বেড়ায়। আর কিছু একটা
পেলেই ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। কথায় কথায় ঝগড়া করাটাই তাদের কু-অভ্যাস। তারা
তুচ্ছ কোন ব্যাপার নিয়েও এতো বাড়াবাড়ি করে যে, সংসারে সবসময় ঝগড়া বেঁধেই
থাকেই। কোন স্ত্রীই এ ধরনের খুঁতখুঁতে স্বভাবের স্বামীকে পছন্দ করে না।
তাই বহু পরিবার ভেঙ্গে যায়। যেমন ধরুন বাসাবাড়ি সাধারণত স্ত্রীরাই
পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু অনেক সময় কাজের চাপে একটু আধটু দেরী
হতেই পারে। অথচ দায়িত্বটা স্ত্রীর একার নয়। স্বামীরও বটে। কিন্তু স্বামী
যদি সেই চিন্তা না করে গজ্ গজ্ করে বলতে থাকেন-টেবিলটা দেখি নোংরা হয়ে
আছে, কেন? এ ঘরে কি কেউ নাই? আহ্ ! কতবার বলেছি এ্যাশট্রেটা কখনো ফ্লোরে
রাখবে না, কে শোনে কার কথা?-(সজোরে )কী হলো, রান্নাবান্না হয়নি নাকি;
ইত্যাদি।
একথা সত্য
যে, সংসারে কাজকর্ম করতে গিয়ে ছোট-খাটো ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতেই পারে।
সেই ভুল যে কেবল স্ত্রীরই হয়, তা নয় বরং স্বামীও ভুল করতে পারেন। এখন ভুল
হলে সেজন্যে পরস্পরকে তিরস্কৃত না করে বরং আলাপ-আলোচনা ও সহমর্মিতার
মাধ্যমে ভুল সংশোধন করতে হবে। আলোচনার সৌহার্দ্যপূর্ণ পথ পরিহার করে
স্ত্রীকে একচেটিয়া দোষারোপ করতে থাকলে স্ত্রী অবশ্যই স্বামীর ব্যাপারে
উদাসীন হয়ে পড়বে। যার পরিণাম না তাদের কারো জন্যে পুরো মঙ্গলজনক হবে, না
তাদের সন্তান-সন্ততির জন্যে। পুরো পরিবার সংগঠনটিই বরং ভেঙ্গে যাবে। এ
ধরণের পরিস্থিতি এড়াতে রাসূলের দিক নির্দেশনার প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই
একমাত্র উপায়। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "তোমরা যারা শুনে শুনেই ঈমান এনেছো,
কিন্তু আন্তরিক বিশ্বাসে যাদের হৃদয় এখনো পূর্ণ হয়নি, তাদেরকে বলি কোন
মুসলমান সম্পর্কে নিন্দা করো না। কারণ যে বা যারা অপরের দোষত্রুটি বা খুঁত
ধরে বেড়ায়, আল্লাহ তাদেরকে সমালোচনা করেন। আর এই রকম কোন ব্যক্তি সে যদি
নিজের বাড়ীতেও থেকে থাকে, তবুও অসম্মানীত হবে।"
একটা ব্যাপার স্বামীদের অন্তরে সাধারণত কমই জাগে, আর তা হলো পুরুষের মতো নারীর মনও পরিবর্তিত আবেগের শিকার। যেমন সুখানুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়, তেমনি ক্রোধ এবং দুঃখেও ভারাক্রান্ত হয়। একঘেঁয়ে ঘরকন্যার কাজ, সন্তানদের কোন আচরণ কিংবা অন্যের কোন কথায়ও আপনার স্ত্রী রেগে থাকতে পারেন। এরকম বিপর্যস্ত মন নিয়ে তুচ্ছ কোন বিষয়েও অন্যদের সাথে তিনি রূঢ় আচরণ করে ফেলতে পারেন। এমন অবস্থায় তার রাগ ভাঙ্গানো স্বামীরই দায়িত্ব। কিন্তু কীভাবে! না, আপনি মোটেই স্ত্রীর রাগ ভাঙ্গাতে গিয়ে প্রভাব খাটিয়ে তার রাগের আগুনকে দ্বিগুন করে তুলবেন না।
বাসায় ফিরে স্ত্রীকে রাগান্বিত দেখলে আপনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন,
হাসি-খুশি থাকুন, কঠোরতা পরিহার করে হাসিমুখে কথা বলুন। টুকিটাকি কাজে
তাকে সহযোগিতা করুন। কোনভাবেই আপনি জানতে চাইবেন না যে, ‘কী ব্যাপার বলো
তো!' বরং আপনার স্ত্রী যদি নিজ থেকে কথা বলতে চায়, গভীর মনোযোগের সাথে তার
কথা শোনার চেষ্টা করুন এবং তার সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল
হবার চেষ্টা করুন। ক্ষোভের কারণ দূর করার কাজে সহযোগিতা করুন, তাকে
সান্ত্বনা দিন। আপনার সাহায্যই তার কাছে সবচেয়ে বেশী মূল্যবান বলে
প্রতীয়মান হবে। এর ব্যতিক্রম কোন আচরণ করলে আপনাদের মধ্যকার মানসিক সংঘাত
তীব্রতর হবে। নবী-রাসূলদের কথা বাদ দিয়ে বলা যায়, দুনিয়ার কোন মানুষই
ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। কিংবা কেউই সম্পূর্ণ নিখুঁত বা সর্বগুণ সম্পন্ন
নয়।
তারপরও বিয়ের আগে প্রতিটি স্বামী মনে মনে কল্পনা করে যে, তার স্ত্রীটি
হবে সর্বগুণে গুণান্বিতা একটি আদর্শ নারী। কিন্তু বাস্তবেতো তা সম্ভব নয়।
সেজন্যে বিয়ের পর কল্পনার স্ত্রীর সাথে বাস্তবের স্ত্রীকে মিলিয়ে দেখলে
বহু অপূর্ণতা চোখে পড়ে। স্বামীটি তখন ভাবতে থাকে, কী চেয়েছিলাম, আর কী
পেলাম! এধরণের হতাশা ব্যক্ত করে পরিপূর্ণতার খোঁজে বাইরের দিকে দৃষ্টি
দেয় । স্ত্রী তাকে ফেরাতে চাইলে স্ত্রীকে মারধর করে, অপমান করে, গালাগালি
করে।
গত ১৮ই জানুয়ারী তারিখের বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর প্রতি যাদের দৃষ্টি
পড়েছে, তারা নিশ্চয়ই আজম রেজা'র ফাঁসীর খবরটি পড়তে ভোলেন নি। আজম রেজা
ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। বিয়ে করেছেন, জয়ন্তী নামের এক সুন্দরী
শিক্ষিকাকে। কিছুদিন চমৎকার দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর আজম রেজা আরেক
সুন্দরী অভিনেত্রীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। কোন স্ত্রীরপক্ষেই এ ধরনের
সম্পর্ক মেনে নেয়া সম্ভব নয়। জয়ন্তীও মেনে নেয়নি। ফলে আজম রেজা নির্মমভাবে
স্ত্রীকে হত্যা করে। আদালত খুনের দায়ে আজম রেজাকেও ফাঁসীর আদেশ দেয়। এই
যে দীর্ঘদিন পর স্বামীর পরকীয়া প্রেমে পড়া, তা নিশ্চয়ই হঠাৎ করে হয়ে
ওঠেনি। একটু একটু করে দিনের পর দিন এরকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে সাধারণত। কিন্তু
কেন? নিশ্চয়ই স্ত্রীর ব্যাপারে স্বামীর প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিযোগ
ঘটেনি, কিংবা এমন কোন ব্যাপার, যা স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবেসে বুঝিয়ে
নিতে পারতো। আর যদি স্বামীই অবৈধ কামনা চরিতার্থতার জন্যেই অসৎ সঙ্গে পড়ে
গিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী নিশ্চয়ই তা আগেই টের পেয়েছে। সেক্ষেত্রে
বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বামীকে বহির্মুখিতা থেকে ফেরানো স্ত্রীর পক্ষে অসম্ভব
ছিল না। তারপরও একান্তই যদি তা সম্ভব না-ই হতো, তাহলে সর্বশেষ পথ
পারিবারিক আদালতে যাওয়া যেত। এসব ক্ষেত্রে নবীজীর শিক্ষা ছিল পরস্পরকে
ক্ষমা করার ব্যাপারে উদার হওয়া। আজম রেজা আর জয়ন্তীর ক্ষেত্রে যেহেতু তা
হয়নি, সেহেতু দুঃখজনক পরিণতি দুজনকে ভোগ করতে হলো। আর পরিবারটি ভেঙ্গে হয়ে
গেল খান খান।
অন্যের
ভুল-ভ্রান্তিকে উপেক্ষা করা ও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা মানুষের একটা
বিশেষ গুন যা জন্তুদের নেই। কেউ যদি অন্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে
তাকে ক্ষমা করে দেয়াই হলো মহত্বের লক্ষণ। ক্ষমার আনন্দানুভূতি উপভোগ করার
মধ্যে যে আত্মিক প্রশান্তি থাকে, তা এক কথায় অলৌকিক। কিন্তু তারপরও মানুষ
হিংসুক হয়, পরশ্রীকাতর হয়, প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়। এই পাশবিক গুনটি যেন
আমাদের ভেতরে বাসা না বাঁধে, সে ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া উচিত। হিংসা এবং
পরশ্রীকাতরতা থেকে মানুষ নিন্দুক হয়ে ওঠে। গীবত চর্চা করে তারা অন্যের
ক্ষতি করতে উদ্যত হয়। কোন পরিবারে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মধুর সম্পর্ক
থাকে, নিন্দুকেরা তাদের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে তৎপর হয়ে ওঠে। এসব
ক্ষেত্রে নিন্দুকেরা এমনসব গুজব ছড়ায়, যা থেকে রেহাই পেতে হলে প্রয়োজন
ঠাণ্ডা মাথায় সংবেদনশীল মন নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মাঝে বিষয়টি
আলোচনা করা। জিজ্ঞাসাবাদ নয় বরং সত্য আবিস্কারের ব্যাপারে উভয়কে আন্তরিক
হওয়া উচিত। কোন রকম রূঢ় মনোভঙ্গী এ ক্ষেত্রে বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে
পারে।
আমি আমার স্বামী, শ্বাশুড়ী ও ননদসহ একত্রে থাকি। প্রথম প্রথম স্বামীর সাথে ভালোই কেটেছে আমার। একটা মধুর দাম্পত্য জীবন আমরা কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের এই সুখ কারো কারো অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্যে আমার স্বামীর কাছে আমাকে অপ্রিয় করে তোলার জন্য আমার সম্পর্কে নানারকম গুজব স্বামীর কানে দেয়া হয়। সেসব গুজব এমন লোকদের কাছ থেকে শোনানো হয় যে স্বামীর পক্ষে তা অবিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্নকারী
জানতে চাইলো-কী ধরণের গুজব একটু বলবেন ? ভদ্র মহিলা বললেন, আমার শ্বাশুড়ী
চব্বিশটা ঘন্টাই আমার খুঁত ধরতে ওঁৎ পেতে থাকে। নানা ছলছুতায় আমার সাথে
ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে চায়। স্বভাবে এমনিতেই তিনি ভীষণ বদমেজাজী। আমার সাথে
ঝগড়া করতে না পারলে আমার ব্যাপারে উল্টো-পাল্টা কথা বলে স্বামীর সাথে আমার
ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সেদিন আমি কেনাকাটা করে বাসায় ফিরছিলাম।
রাস্তায় ভীষণ জ্যাম ছিল। বাসায় ফেরার পর শ্বাশুড়ী আমাকে জেরা শুরু করে
দিলেন। কেন দেরী হলো, কোথায় গেছো, কার সাথে পিরিতি করে বেড়াও? ইত্যাদি সব
বাজে কথা।
আমাদের
সমাজে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা মানবতাকে স্তব্ধ করে দেয়। ধরা যাক এরকম একটি
চিত্র: দেখা গেল-একটা ঘরে হঠাৎ আগুন, সাথে চীৎকার চেঁচামেচি।
পাড়া-প্রতিবেশীরা ঐ চীৎকার শুনে এগিয়ে এলো। যেই রুমের ভেতরে আগুন, সেরুমের
দরজা খুলে ভেতরে দেখলো ঐ বাসার সুন্দরী বধূটির গায়ে আগুন জ্বলছে।
তাড়াহুড়া করে আগুন নিভিয়ে বধূটিকে নিয়ে গেল মেডিকেলে। সৌভাগ্যবশত: বধূটি
প্রাণে বেঁচে গেল। সুস্থ হবার পর গৃহবধূটিকে বাসায় যেতে বললে সে বললো,
বাসায় যাবো না। প্রশ্ন করা হলো কেন যাবেন না? ভদ্র মহিলা বললো, ঐ বাসায়
যাতে থাকতে না হয় সেজন্যেই তো মরতে চেয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করা হলো কেন থাকতে
চান না ঐ বাসায়? জবাবে বধূটি বললো, সে অনেক কথা। প্রশ্নকারী আবার বললো,
বলুন! আমরা শুনবো। তারপর ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করলেন। অবশেষে আমার স্বামী
যখন বাসায় ফিরলেন, শ্বাশুড়ী কান্নাকাটি করে তার ছেলেকে সব ঘটনা বাড়িয়ে
বাড়িয়ে বলার পর বললো, কোন মাংস বিক্রেতার সাথে নাকি আমার বাজে সম্পর্ক
আছে। একথা শুনে আমার স্বামী স্বাভাবিকভাবেই রেগে গেলেন। আমিও রাগে-দুঃখে
ভেঙ্গে পড়লাম। আমি নিজেকে শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করলাম। এই বলে বধূটি
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
যে ঘটনাটি এতোক্ষণ আমরা শুনলাম, এধরনের ঘটনা কারোরই কাম্য নয়। এধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে পারিবারিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়বে। পরিবারের ভাঙ্গন রোধ করার জন্য তাই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। এই ঘটনাটিতে একদিকে রয়েছে মা-বোন, অন্যদিকে স্ত্রী। উভয়ের প্রতিই স্বামী পুরুষটির দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বামী পুরুষটিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে অগ্রসর হতে হবে। কোন রকম বোকামীর পরিচয় দিলেই সমূহ বিপদের আশঙ্কা দেখা দেবে। যে ঘটনাটি আমরা একটু আগে জানলাম, এধরনের ঘটনা অনেক পরিবারেই অহরহ ঘটছে। এর যে কী সমাধান তা অনেকেই ভেবে কুল পান না। অথচ ইসলাম এসব ব্যাপারে চমৎকার সমাধান দিয়েছে।
প্রতিটি ছেলেই বিয়ের আগে বাবা মায়ের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠে। ছোট বেলা থেকেই সন্তানেরা বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। বাবা-মা যেহেতু ছেলেকে লালন-পালন করে বড়ো করে তোলেন, সেহেতু তারা স্বাভাবিকভাবেই আশা করেন যে, বড়ো হয়ে ছেলে তাদের দেখাশোনা করবে। কিন্তু বিয়ে করার পর বাবা-মা যখন দেখেন যে, ছেলে তার নতুন সংসার তথা স্ত্রীর প্রতিই বেশী যত্নশীল হয়ে পড়ছে, তখন বাবা-মা কষ্ট পান। ছেলেকে বিয়ে দিয়ে তারা আপাতত দৃষ্টিতে স্বাধীন করে দিলেও মনে মনে ঠিকই প্রত্যাশা করেন যে, ছেলে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাবে। কিন্তু বাস্তবে তা না দেখতে পেয়ে ভাবেন পুত্রবধূটিই এই পরিস্থিতির কারণ। সেজন্যেই তারা পুত্রবধূর ওপর থেকে ছেলের মনোযোগ কমাতে নববধূটির পেছনে লেগে পড়েন। আর বাবা-মায়ের এই দুঃখজনক আচরণ ছেলের নতুন জীবনের জন্যে মোটেই কল্যাণকর নয়। তাই ছেলেকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে যার যার অধিকার বুঝিয়ে দেয়াই হবে যুক্তিযুক্ত।
বাবা-মা ছেলের কাছ থেকে
প্রত্যাশা করে যে, ছেলে উপার্জনক্ষম হলে তাদের প্রতি ছেলে লক্ষ্য রাখবে।
বাবা-মায়ের এই প্রত্যাশা তাদের অনিবার্য অধিকার। এই অধিকার বিয়ের পরও
যথাযথভাবেই অটুট থাকে। ফলে স্ত্রীর প্রতি মনোযোগী হবার পাশাপাশি
বাবা-মায়ের প্রতি আন্তরিক দায়িত্ব পালনেও সক্রিয় হতে হবে।
বাবা-মায়ের
আর্থিক সংকট মেটানো উপার্জনক্ষম সন্তানের অন্যতম কর্তব্য। তাই আগের মতোই
বাবা-মায়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা ছেলের
কর্তব্য। এই কর্তব্য যদি ছেলে পালন করে, তাহলে বাবা-মা ছেলের বৌ এবং
সংসারের মঙ্গল কামনা করবে। সে ক্ষেত্রে ছেলের বৌ-এর পেছনে লাগার কোন কারণ
আর ঘটবে না। কিন্তু তারপরও ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ঘটে থাকে, সেসব ঘটনার
ক্ষেত্রে ছেলেকে গভীরভাবে ভাবতে হবে-বাবা-মায়ের কথা কতোটা ন্যায্য। অন্যায়
বা অধর্মীয় কোন আদেশ মানতে ছেলে বাধ্য নয়-একথা বাবা-মা এবং ছেলে সবারই
জানা থাকা উচিত। বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের কারণেই যদি তারা বৌকে
অন্তরায় ভেবে থাকেন, সেক্ষেত্রে, ছেলের উচিত হবে-বাবা-মায়ের সাথে
সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা। বাবা-মাকে তার ঘরে ডেকে আনা, বাচ্চাদের বলা তারা
যেন দাদা-দাদীকে সম্মান করে চলে। স্ত্রীকেও বলতে হবে সে যদি শ্বশুর
শ্বাশুড়ীকে সম্মান করে চলে, শ্বশুর-শ্বাশুড়ীও ছেলের বৌ-এর বিরুদ্ধে লেগে
পড়ার পরিবর্তে বরং বৌকে নিয়ে গর্ববোধ করবে, পুত্র বধূকে তারা সকল ক্ষেত্রেই
সহায়তা করবে।
এখানে যে
কথাটি উল্লেখ করা দরকার তাহলো, বাবা-মাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে স্বামী
স্ত্রীমুখী হয়ে পড়ুক-স্ত্রীদের এ ধরনের চিন্তা একেবারেই অন্যায্য। এ ধরনের
দাবী না ন্যায়সঙ্গত না বাস্তবসম্মত। বরং স্ত্রীরা কৌশলে বুদ্ধিমত্তার
সাহায্যে শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর সাথে এমন আচরণ করতে পারে, যাতে তারা ভাবে যে বৌ
তাদের সংসারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। তাতে উভয়কূল রক্ষা পাবে। মনে
রাখতে হবে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা যত্নের মধ্যে সন্তানের কল্যাণ নিহিত
রয়েছে। বাবা-মায়ের বাইরেও পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকে ঈর্ষুক থাকতে
পারে।
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, তাহলো বাবা-মা সাধারণত ছেলের অমঙ্গল
কামনা করে না। তারা যদি ছেলের সংসারে ঝামেলা ঘটানোর কোন কারণও হয়, তা কেবল
তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য। ছেলে যদি তাদের অধিকার ঠিকমতো আদয়
করে, তাহলে বাবা-মা ছেলের কল্যাণকামী হয়ে ওঠে। কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীরা
হিংসা করে যদি কোন গীবত চর্চা করে, তাহলে তা খুবই ভয়ঙ্কর। তাদের কথায় হুট
করে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই বোকামীপূর্ণ কাজ হবে। মনে রাখতে হবে বৌ আপনার
জীবন সঙ্গী। সেও রক্ত-মাংশের মানুষ। পৃথিবীর কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়।
বৌ-এর ব্যাপারে কেউ যদি আপনার কানে কথা লাগায়, তাহলে ধীরে-সুস্থে গভীর
চিন্তা-ভাবনা করে ঠান্ডা মাথায় তা প্রতিহত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
কোনভাবেই বাইরের লোকের কুৎসা রটনাকে পাত্তা দেয়া যাবে না।
বৌ-এর সাথে
ভালোবাসাপূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে আলোচনা করার পর যদি মনে হয় যে, সত্যিই বৌ
কোন অন্যায় করে ফেলেছে, তাহলে বৌ-এর ঐ অন্যায়কে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে
দেখাই হবে বড় মনের পরিচয়। যুক্তি দিয়ে বৌকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা
করুন-এর ফলে তাদের কী ক্ষতি হতে পারে, স্ত্রীকে হুট করেই কোন শাস্তি দেয়া
একেবারেই ঠিক নয়। তাকে বুঝিয়ে বলার পর নিশ্চয় তার ভেতরে অনুশোচনাবোধ কাজ
করবে। এর ফলে ভুলের পুনরাবৃত্তি আর নাও হতে পারে। অন্যদিকে আপনার স্ত্রী
কৃতজ্ঞতায় আপনার প্রতি সব সময় সশ্রদ্ধ থাকবে। পরিণতিতে পারিবারিক শান্তি ও
শৃঙ্খলা থাকবে অক্ষুন্ন। ক্রোধ খুবই মারাত্মক জিনিস। ক্রোধের আগুনে পুড়ে
বহু সুন্দর সংসার ছারখার হয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে যাবার পর ক্রুদ্ধরা কিন্তু
অনুতপ্ত হয়। ফলে ক্রোধ নয়, ধৈর্য্যরে পরিচয় দিন। আল্লাহ ধৈর্য্য
ধারনকারীদের সাথে রয়েছেন।
সোনালী
নীড়ের গত পর্বে আমরা পুত্রবধূর ওপর ছেলের বাবা-মায়ের অসন্তোষজনিত জটিলতার
ক্ষেত্রে স্বামীর কর্তব্য নিয়ে বথা বলেছি। এবারের পর্বে আমরা মেয়ের সংসারে
ছেলের শ্বাশুড়ীর নাক গলানো সংক্রান্ত জটিলতায় স্বামীর করণীয় সম্পর্কে কথা
বলার চেষ্টা করবো।
ইংরেজীতে
একটি প্রবাদ আছে To Err Is Human অর্থাৎ মানুষ মাত্রই ভুল আছে। সত্যিই
তাই, আল্লাহ নিজেই যাদেরকে পাপ থেকে মুক্ত রাখবার ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা
ব্যতীত অন্য কেউই ভুলের উর্ধ্বে নয়। ফলে বাপের বাড়ীতে স্বাধীনভাবে বেড়ে
ওঠা যে মেয়েটি হঠৎ বধূ হয়ে অচেনা একটা পরিবেশে এলো, সে যে ছোট-খাটো
ভুল-ত্রুটি করে বসতেই পারে, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। নববধূটি সাধারণত: যে
ভুলগুলো করে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-(১) স্বামীর সাথে রূঢ় আচরণ করা। (২)
স্বামীর ইচ্ছার বিরূদ্ধে কিছু করে বসা এবং (৩) বেখেয়ালীপনাবশত স্বামীর
আর্থিক ক্ষতি ঘটাবার মতো কোন আচরণ করা ইত্যাদি।
কোন স্ত্রীই সাধারণত প্রথম প্রথম স্বামীর সাথে রূঢ় আচরণ করে না। অবশ্য দু একটি ঘটনা ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। ধীরে ধীরে স্ত্রীদের অনেকেই রূঢ় আচরণ করতে প্রলুদ্ধ হয়। এর কারণ অনেক সময় স্ত্রীদের মা অর্থাৎ ছেলের শ্বাশুড়ী। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা না করলে ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে। আমরা বলছি না যে, ছেলেদের শ্বাশুড়ীরা সবাই একইরকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তবে মেয়ের বিয়ে দেবার পরপর মেয়ের মা স্বাভাবিকভাবেই কামনা করে যে, তার জামাই হবে তারই মন মতো একটা আদর্শ ছেলে।
কিন্তু সমস্যা হলো প্রতিটি মানুষই মূলত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের
অধিকারী। ফলে আপন-আপন স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই শ্রদ্ধা-সম্মানের ভিত্তিতে
জামাই-শ্বাশুড়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু শ্বাশুড়ী যখন দেখে যে
জামাইর চালচলন একটু অন্য রকম, তখন শ্বাশুড়ী জামাইকে নিজের আদর্শে গড়ে
তোলার চেষ্টা চালায়। এ ধরণের চেষ্টা প্রথম দিকে মেয়ের কল্যাণেই মূলত হয়ে
থাকে। কিন্তু পরক্ষণে জামাই যখন তার ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্যে অটল থাকে,
তখন শ্বাশুড়ী মেয়েকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে জামাই সংশোধন পরিকল্পনা
বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। এভাবে ছেলের শ্বাশুড়ী, মেয়ের সংসারে এবং জীবনে
আস্তে আস্তে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। শ্বাশুড়ীর পরিকল্পনা ব্যর্থ
হলে জামাতার ওপর মনে মনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আর এই ক্ষিপ্ততার প্রয়োগ ঘটানো
হয় মেয়েকে দিয়ে। মেয়ে তাই ধীরে ধীরে তার স্বামীর সাথে একটু অন্যরকম আচরণ
শুরু করে দেয়।
স্বামী যে ধরনের আচরণ তার স্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করে,
স্ত্রী সেরকম আচরণ না করে কেমন যেন বিগড়ে যেতে থাকে। এমনকি স্বামীর কোন
কোন কর্মকান্ডের সমালোচনায় মুখরও হয়ে ওঠে। মেয়েকে রীতিমতো শ্বাশুড়ী
বিভিন্ন রকম নির্দেশ দিতে শুরু করে, আর মেয়েও আগ-পর চিন্তা না করে মায়ের
আদেশ-নির্দেশকে অনুসরণ করতে শুরু করে। এমনকি স্বামীকে তার আচার-আচরণ
পরিবর্তন করার জন্য বলতে শুরু করে। মা-মেয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়। এই
সম্পর্ক স্বভাবগত, প্রকৃতিগত । বছরের পর বছর ধরে যে মেয়ে তার মায়ের একান্ত
আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বড়ো হয়েছে, স্বামীর তুলনায় মা-ই মেয়ের কাছে বেশী আপন বলে
মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। সেজন্যে মায়ের আদেশ শিরোধার্য করে মেয়ে তার স্বামীর
সাথে দুর্ব্যবহার করতেও দ্বিধা করে না। অন্যদিকে জামাই যখন শ্বাশুড়ীর
মনোপুত: হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, তখন শ্বাশুড়ী মেয়ের জামাতার ব্যাপারে কঠোর
মনোভাব পোষণ করতে শুরু করে।
ফলে দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে মহা-অসন্তোষ,
দ্বন্দ্ব-কলহ। যার পরিণতি হয় বিবাহ বিচ্ছেদ, অথবা চির অশান্তি। স্বামীর
সাথে এভাবেই স্ত্রী রূঢ় আচরণ করতে শুরু করে। এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
তাহলো, শ্বাশুড়ীর সাথে জামাতার সম্পর্ক মানেই যে বৈরী সম্পর্ক এমনটি ভাবার
কোন কারণ নেই। বরং সম্পর্কটা সাধারণত এর বিপরীত অর্থাৎ শ্বাশুড়ীর সাথে
জামাইর সম্পর্ক খুবই আন্তরিক ও শ্রদ্ধা-স্নেহের। মেয়ের মঙ্গল কামনা থেকেই
মূলত: শ্বাশুড়ীরা মেয়ের সংসারে প্রভাব বা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে। কিন্তু
অজ্ঞতাবশত: অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়।
সেজন্যে শ্বাশুড়ীদের
ব্যাপারে পুরুষদের অতিরিক্ত সমালোচনার মনোভাব পরিহার করে চলাই শ্রেয়।
তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে শ্বাশুড়ীরা খুবই ভালো প্রকৃতিরও হয়ে থাকেন। এক
ভদ্রলোক বলেছেন, তাঁর ভাষায় "আমার শ্বাশুড়ী যেন সাক্ষাৎ দেবী। তিনি যেমন
দয়াবতী, তেমনি সবকিছু ভালোমত বুঝতেও পারেন। তাই আমি তাকে মায়ের মতোই
ভালোবাসি। আমাদের সমস্যায় তিনি সবসময় আমাদের পাশে থাকেন। তার অস্তিত্ব যেন
আমার পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য এক নিশ্চয়তা স্বরূপ।"
তাই বলা
যায়, শ্বাশুড়ী মাত্রই খারাপ নয় এবং শ্বাশুড়ীই মেয়ের সংসারে জটিলতা সৃষ্টির
একমাত্র কারণ নয়। আরো অনেক কারণেও সংসারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেজন্যে
শ্বাশুড়ীর সাথে বা শ্বশুর বাড়ীর সাথে সমস্যা এড়িয়ে চলার জন্য বুদ্ধিমানের
কাজ হলো শ্বশুর পক্ষীয় আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা। আসলে
স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই পরস্পরের বাবা-মা, ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজনদের সাথে
সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা। এতে উভয়েরই কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর সামনে কখনোই তাদের মেয়ের সমালোচনা করা উচিত নয়। বরং
তাদের কন্যার প্রতি জামাতার ভীষণ ভালোবাসার দিকটিই ফুটিয়ে তোলা উচিত।
মেয়ের বাবা-মাও কিন্তু অভিভাবক। ফলে নিজের বাবা-মায়ের মতো স্ত্রীর
বাবা-মায়ের কাছেও অভিভাবকসুলভ পরামর্শ গ্রহণ করে সংসার জীবনে তা কাজে
লাগানো যেতে পারে। স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েরই উচিত আপন-আপন
শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর সাথেই কেবল নয় বরং শ্বশুর বাড়ীর সবার সাথেই সহৃদয় আচরণ
করা। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি ও সাফল্য নেমে আসবে। নবী করীম
(সাঃ) বলেছেন, "সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্যসমূহ যা আমার উম্মতকে বেহেশতে
প্রবেশ করাবে তা হচ্ছে আল্লাহর ভয় ও উত্তম আচরণ।" ইমাম আলী (আঃ) বলেছেন,
সদাচরণ প্রচুর পরিমাণে জীবনোপকরণ দান করে এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কের
ঘনিষ্ঠতাকে বাড়িয়ে দেয়। তিনি আরো বলেছেন, বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হলো জ্ঞানীর
মতো কাজ। ফলে প্রতিটি মানুষের উচিত সর্বাবস্থায় উত্তম আচরণ করা।
সুখ-শান্তির
মূল ভিত্তি হলো উত্তম আচরণ। তাই সদাচরণের অভ্যাস গড়ে তোলা শান্তিকামী
প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সদাচরণের গুরুত্ব বোঝাতে
গিয়ে রাসূল (সাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আপনি যদি কঠোর ও নির্মম হতেন
তাহলে তারা নিশ্চিতরূপে আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত। অন্যত্র বলেছেন, রাসূল
(সাঃ)এর মধ্যেই রয়েছে, সর্বোত্তম চরিত্রের আদর্শ। তাই জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে রাসূলের আদর্শকে অনুসরণ করা । পারিবারিক
সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তার অনুসরণের কোন বিকল্প নেই।
আসলাম
সাহেব বাসায় ফিরে দেখলেন তার স্ত্রী ঘরে নেই। ক্লান্তিকর কাজ শেষে ঘরে
ফিরে স্ত্রীকে না দেখা আসলাম সাহেব কেন, সকল স্বামীর পক্ষেই কষ্টকর একটা
ব্যাপার। কিন্তু তারচেয়েও কষ্টকর হলো স্ত্রী কোথায় গেল-এটা জানা না থাকা।
আসলাম সাহেব সোফায় বসে ভাবছেন, এমন সময় একটা ফোন এলো- আসলাম সাহেব হ্যালো
বলতেই ফোনটা কেটে গেল। স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আরেকটা দুশ্চিন্তা ঢোকার কথা।
আসলাম সাহেব পায়চারী করতে করতে স্ত্রীর ড্রেসিং টেবিলের ওপর চিঠির প্যাড
খোলা দেখতে পেলেন। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সন্দেহজনক বৈ কি। ব্যাপারটা নিয়ে
ভাবতে ভাবতে যদি তার স্ত্রী ঘরে এসেই পড়তো তাহলে আসলাম সাহেবের কী করণীয়
ছিল? কোথায় গেছ? কেন গেছ? কেন আমাকে আগে জানাওনি? চিঠির প্যাড এখানে কেন?
কার কাছে গোপনে গোপনে চিঠি লেখ ?-এসব করা কি সঙ্গত ? না, মোটেই না। কারণ
এটা সন্দেহপ্রবণ মনের অভিব্যক্তি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রবিত্র কোরআনে
বলেছেন, হে ঈমানদারগণ, অধিকাংশ অমূলক ধারণা করা পরিহার কর, কেন না আন্দাজ
অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে নিশ্চিতরূপে গুনাহের কাজ হিসেবে পরিগণিত। তাছাড়া
ইসলাম সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য না পাওয়া পর্যন্ত সন্দেহ করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা
করেছে। হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, সন্দেহ করার ব্যাপারে সতর্ক হও, কেননা
সন্দেহ ইবাদত ধ্বংস করে এবং গুনাহ বৃদ্ধি করে।
ফলে সন্দেহ করা যাবে না। সন্দেহ পোষণ করলে স্ত্রীর বিশ্বস্ততাকে অবিশ্বাস করা হয়। এ ধরণের সন্দেহপরায়নতা পারিবারিক জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে। এ রকম মানসিকতায় যারা ভোগেন তারা সারাক্ষণ স্ত্রীকে গোয়েন্দার মতো অনুসরণ করতে থাকেন। কিছু একটা হলেই সন্দেহের স্বপক্ষে প্রমাণ দেখতে পান। তার কাজই হয়ে পড়ে কেবল স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা। অথচ ধৈর্যের সাথে সন্দেহ মুক্ত মন নিয়ে স্ত্রীকে দেখলে এক সময় স্ত্রী নিজেই হয়তো আপনাকে জানাবে কোথায় গেছে, কি করেছে, কার কাছে চিঠি লিখেছে। ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে স্বামী নিজেই এক সময় তার স্ত্রীকে বলেছিল-বাড়ীতে একটা চিঠি লিখতে। সেই চিঠিটাই লিখেছিল তার স্ত্রী। আর পোস্ট করার জন্যে গিয়েছিল পোস্ট অফিসে। কিন্তু পোস্ট অফিসে যথারীতি ভীড় থাকায় বাসায় ফিরতে তার দেরী হয়ে যাচ্ছিল। সেজন্যে টেলিফোন করে স্বামীকে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু বাসার টেলিফোন সেটে সমস্যা থাকায় রিং হওয়ার পর কেটে যাচ্ছিল। যার ফলে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এই সত্যটি যতোক্ষণ
না অপনি জানছেন, ততোক্ষণ পর্যন্ত আপনার মন থেকে সন্দেহের কালিমা দূর
হচ্ছে না। কিন্তু কথা হলো স্ত্রীকে সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিলে
স্ত্রী কি আপনাকে এই তথ্যটি মজা করে জানাতে যাবে ? অতএব সন্দেহ পরায়ন
হওয়াটা মোটেই কল্যাণের নয় বরং হাসিখুশী থাকুন, স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত হন।
মহানবী
হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, "যদি কেউ স্ত্রীর নামে দুঃশ্চরিত্রের মিথ্যা
অপবাদ দেয়, তাহলে তার সমস্ত ভালকাজের সুফল বাতিল হয়ে যাবে। যেমন সাপের গা
থেকে তার খোলস ঝড়ে পড়ে।" নবীজী আরো বলেছেন, যে কেউ ঈমানদার নারী বা
পুরুষের নামে মিথ্যা অভিযোগ করে, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ তাকে জ্বলন্ত
অগ্নিকান্ডের ওপর বসিয়ে দেবেন, যেন সে এই অপরাধের যোগ্য শাস্তি পায়।"
ফলে অমূলক
সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকুন। তারমানে এই নয় যে, আপনি স্ত্রীর আচরণের
ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসিন থাকবেন। বরং আপনার দেখা আলামতটাকে আপনি নিজেই
যাচাই করুন-স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্যে নয় বরং সত্যটাকে জানার
জন্যে। সত্য না জেনেই কোন রকম সিদ্ধান্ত নেয়া, বাড়াবাড়ি করা মারাত্মক ভুল।
যে ঘটনাটি আমরা আলোচনার শুরুতে জানলাম, সেখানে সন্দেহবশত স্ত্রীকে
পরকীয়ার অভিযোগে যদি অভিযুক্ত করতেন, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতো? না, সেটি
মোটেই ভালো হতো না। স্ত্রী অপমানিত বোধ করতো। নিজস্ব সম্মান ও ব্যক্তিত্ব
হারানোর যন্ত্রণায় স্ত্রী অবশ্যই নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতেন। অথচ
স্ত্রী মোটেই কোন অন্যায় করেননি।
শুধুমাত্র ছোট্ট একটি অবিশ্বাস একটি
সুন্দর সংসারকে ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে দেয়ার আশঙ্কা থেকে যেত। স্বামীর অমূলক
সন্দেহের ব্যাপারটা যদি বাইরে জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে আরো বড়ো বিপদ হতে
পারে। মানুষ মাত্রই শত্রুমিত্র পরিবেষ্টিত থাকে। আপনার শত্রুরা এই
সন্দেহের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে আপনার সংসারের ব্যাপারে নাক গলাবার সুযোগ পাবে।
তারা আপনার সন্দেহকে যথার্থ বলে প্রমাণ করার কুমতলবে বিভিন্ন গালগল্প ও
বানোয়াট ঘটনার জন্ম দেবে। যা আপনার কাছে সত্য বলে মনে হবে। আপনি যখন সে
সবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা মহা বিপদে পড়বেন-তখন তারা দেখে দেখে
উপহাসের হাসি হাসবে।
মনে
রাখবেন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালবাসার সম্পর্ক। এখানে তাই গভীর আবেগ ও
আন্তরিকতা কাজ করে। কোন রকম সন্দেহ-অবিশ্বাস ভালবাসা বা আন্তরিকতাকে নষ্ট
করে দেয়। সহজ-সরল পবিত্র মনে যদি একবার সন্দেহের কালো দাগ পড়ে, ঐ দাগ
চিরজীবন থেকে যাবে। তাই যেকোন কাজ চিন্তা-ভাবনা করে করুন। হুট করে কোন কাজ
করে বসা মারাত্মক ভুল, যেমনটি কবিও বলেছেন- একটু খানি ভুলের তরে অনেক
বিপদ ঘটে ভুল করেছে যারা সবাই ভুক্তভোগী বটে।
এখানে
একটি কথা বলা প্রয়োজন, তাহলো স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সন্দেহপরায়নতার যদি
কোন কারণই না থাকে, অর্থাৎ স্ত্রী যদি সত্যিই সন্দেহজনক কোন কাজ না করে
থাকে, তাহলে স্বামীর সন্দেহপ্রবণতা একটা মানসিক রোগ বৈ কি! এ ক্ষেত্রে
স্ত্রীর কিছু করণীয় থেকে যায়। প্রথমতঃ আপনাকে গভীর মনোযোগ ও আন্তরিকতা
দিয়ে দেখতে হবে, আপনার স্বামী আপনার ঠিক কোন আচরণটিকে সন্দেহজনক ভাবছে।
যদি আবিস্কার করছে সক্ষম হন, তাহলে ঐ ধরণের কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। আপনি
এমনটি ভাববেন না যে আপনি আপনার স্বামীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাস হয়ে পড়েছেন।
বরং একজন স্ত্রী হিসেবে আপনার মানসিকভাবে অসুস্থ স্বামীর প্রতি এটি আপনার
দায়িত্ব। আপনি আপনার ভালবাসা দিয়ে সেবা-যত্ন দিয়ে স্বামীকে সুস্থ করে তোলার
চেষ্টা করুন।
এভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালবাসার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার সমস্যাগুলো সমাধান করা চেষ্টা করুন। একটি সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল পরিবার গঠনের স্বার্থে এ ধরণের আত্মত্যাগের কোন বিকল্প নেই। হযরত আলী (আঃ) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করবো। তিনি বলেছেন, যে অন্যের দুর্বলতার অনুসন্ধান করে, তাকে প্রথমে নিজের দিকে তাকাতে হবে।
"রহিম
সাহেব বেসরকারী একটি অফিসের কর্মকর্তা। নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অফিস করে
অভ্যস্ত। পাঁচটার পর যথারীতি অফিসের কাজ গুটিয়ে হটপটটি কাঁধে ঝুলিয়ে বাসা
অভিমুখে রওনা হলেন। দোতলা ভলভো সার্ভিসের অপেক্ষায় আছেন কাউন্টারের সামনের
সারিতে। আচমকা পেছন থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন। জামা-প্যান্ট
ধূলি-ধূসর হয়ে গেল। পেছন ফিরে যেসব শব্দ বা বাক্য তিনি সজোরে উচ্চারণ
করলেন, তা সাধারণত কেউই শুনতে চায় না। আর শোনার পর নিস্ক্রিয় থাকে না।
ভলভোয় একটু ভদ্রগোছের মধ্যবিত্তরাই চড়ে। তাই কেউই তার অভদ্র শব্দগুলোর
জবাব দিল না। ঝগড়াটে মানুষ ঝগড়া করতে না পারলে স্বস্তি পায় না। মনের পোটে
প্রাণীটি ভেতরেই রয়ে গেল। অবশেষে বাসায় ফেরার পর বৌয়ের হাতে হটপটটি দেয়ার
সময় প্রাণীটি বেরিয়ে এলোঃ কী ছাইপাঁশ রান্না করো আজকাল, এসব কি খাওয়া যায় ?
সারাদিনে সামান্য একটু রান্না করবে-তারও এই হাল! যত্তোসব। বারেক, বাসু
ওরা কোথায়?
বৌঃ নিরুত্তরই থাকলো। কোন কথাই বললো না।
রহিম সাহেব বললো : কথা কানে যায় না? কোথায় ওরা!
এদিকে বৌ কাঁদতে কাঁদতে অন্দরে চলে গেল। তার ছেলে দুটি মায়ের রুমে আজ্রাইলের ভয়ে চুপটি মেরে পড়ে আছে।
এদিকে বাসায় রহিম সাহেবের বন্ধু এলেন হঠাৎ করেই। তিনি রহিম সাহেবকে তার কূশলাদি জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই জবাব দিলেন, "ভালো আর থাকলাম কই, ঘরে-বাইরে সব খানেই অশান্তি আর অশান্তি। তোর ভাবীকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম ছেলেপুলেগুলো কোথায়, সে তার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।"
দুই
বন্ধুর এরকম কথাবার্তার মাঝে রহিম সাহেবের স্ত্রী মেহমানকে সালাম দিয়ে
ড্রইংরুমে এলেন। পারস্পরিক কূশল বিনিময়ের পর ভদ্র মহিলা চা আনার কথা বলে
ভেতরে যাচ্ছিলেন, এমন সময় রহিম সাহেব টিপপনি কেটে বললেন, "তোমার যেই চা, ও
আর খাওয়া লাগবে না। বরং ফল-টল কিছু দাও"। রহিম সাহেবের স্ত্রী লজ্জিত হয়ে
অন্দর মহলে চলে গেলেন।
এবারে
আসুন ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। প্রতিটি মানুষেরই আলাদা আলাদা
ব্যক্তিত্ব রয়েছে, আত্মমর্যাদা রয়েছে। মর্যাদা এমন একটি ব্যাপার, যা অনেকের
কাছেই সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারীরাই কেবল
ধন-সম্পদের লোভে মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
কিন্তু যারা সৎ তারা মর্যাদাকে সব কিছুর উপরে স্থান দেয়। নারীরা স্বভাবতই
লজ্জাবতী। সৎ নারীদের কাছে অর্থাৎ লজ্জাশীলা নারীদের কাছে মর্যাদার
গুরুত্ব বেশী। স্ত্রীরাও স্বামীদের কাছে একইভাবে মর্যাদা পেতে আশা করে।
স্বামীরা যদি তাদেরকে অমর্যাদা কিংবা অপমানিত করে, তাহলে তারা ভীষণ আহত
হয়। আর স্ত্রীদের অর্থাৎ নারীদের অনেকেরই স্বভাব হলো, আহত হলেও তা প্রকাশ
না করা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি সে আহত হবার বেদনা
লালন করতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বামীর ব্যাপারে নিস্পৃহ মনোভাব দেখা দেয় এবং
ঘৃণা করতে শুরু করে। অথচ স্ত্রী হলো আপনার জীবনসঙ্গিনী, আপনার সেরা
বন্ধু, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
ফলে সে-ই আপনার কাছ থেকে বন্ধুত্বের
শ্রেষ্ঠ মর্যাদা পাবার অধিকার রাখে। স্ত্রীকে সম্মান করলে তা
প্রেম-ভালোবাসায় পরিণত হয়। ফলে স্ত্রীও আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরক্ত
হয়ে পড়বে। এই সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যাপারটি কিন্তু আলাদা কোন
আনুষ্ঠানিকতার মতো ঘটনা নয়। বরং উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সকল কাজে কর্মেই
সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে। যখন বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা
শুরু করবেন, স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিন। অফিসে এসে কাজের ফাঁকে খোঁজ
নিন। বাসায় ফেরার পর দরজা খুলতেই তার আগে আপনিই সালাম দিন। সারাদিন কেমন
কাটলো, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হলো কিনা, সন্তানেরা জ্বালাতন করলো কিনা, এসব
খোঁজ-খবর নিন।
তারপর যতোক্ষণ একত্রে বাসায় থাকেন, সন্তানদের দেখাশোনার
দায়-দায়িত্ব পালনে নিজেও অংশ নিন। স্ত্রী আপনাকে নিষেধ করলে আপনি বলুন
সারাদিন তো তুমিই জ্বালাতন সহ্য কর। তার খানিকটা আমাকেও নিতে দাও। আপনার
স্ত্রী এতে কৃতজ্ঞতায় বিনয়ী হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়া করতে বসলেন-তার
রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন।
ঠাট্টা-মশকরা করেও স্ত্রীকে বিদ্রুপ করা বা
অসম্মানিত করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। কারণ আপনি ভালোবেসেই যে
ঠাট্টা করেছেন এটা সে বুঝবে। সেজন্যে হয়তো কিছু মনে করবে না। তবে মনে মনে
হয়তো ঠাট্টাটিকে সে অপছন্দই করতে পারে। কী প্রয়োজন! ঠাট্টার পরিবর্তে বরং
প্রশংসার কাব্যিক পথ বেছে নিন। মজা যদি করতেই হয়, তাহলে এমন ধরনের রসিকতা
করুন, যাতে মজাও পাওয়া যায় আবার সম্মান-মর্যাদায়ও আঘাত না লাগে।
কোন
মজলিসে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সমাবেশে কখনই স্ত্রীকে খাটো করে বা অমর্যাদা
করে কথা বলবেন না। বরং তাকে সম্মান দিয়ে তাকে প্রশংসা করুন। এতে আপনার
বন্ধু মহলেও আপনার স্ত্রীর সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে আপনারা
দুজনেই সম্মানিত হবেন। আর পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা
সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সেইসাথে দাম্পত্য জীবন ও পরিবারে সুখ-শান্তি ও সৌরভময় এক
পরিবেশ বিরাজ করে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যারা মহৎ হৃদয়
সম্পন্ন্, একমাত্র তারাই নারীদের সম্মান প্রদর্শন করে। তিনি আরো বলেছেন, "
যে পরিবার অর্থাৎ স্ত্রীকে অসম্মান করে, সে নিজের জীবনের সুখ নষ্ট করে
ফেলে।"
রাসূল
(সাঃ)এর এই মহান বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাঁর সকল উম্মতের উচিত
নিজ নিজ স্ত্রীকে সম্মান করা। ইমাম সাদিক (আঃ)ও তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে
বলেছেন, "যে বিয়ে করেছে তার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো স্ত্রীকে সম্মান
করা।" পারিবারিক সুখ-শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থেই তারা স্ত্রীর প্রতি
সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু এই সম্মান দেখানোর
বিষয়টি অন্তর থেকে উত্থিত হওয়াই বাঞ্চনীয়। সম্মান ভালোবাসারই প্রকাশ। ফলে
ভালোবাসা যেমন অকৃত্রিম হওয়া দরকার, সম্মান প্রদর্শনও ঠিক তাই হওয়া উচিত।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বিচিত্র ঘটনাবলীর সম্মুখীন হয়। এসব ঘটনা সবসময় সুখকর
নাও হতে পারে। অফিসে বিচিত্র মানসিকতার সহকর্মী থাকে। সবাই যে বন্ধু সুলভ
হবে তা নাও হতে পারে। ফলে আপনি যদি কারো কাছ থেকে কখনো অবন্ধুসুলভ আচরণ
পান, তাহলে আপনার মনটা খারাপ হয়ে থাকতে পারে। তার উপর হয়তো বাসের জন্য
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেলেন, কিংবা দুর্ভাগ্যবশত: কোন ছিনতাইকারী
আপনার সর্বস্ব লুট করে নিল-এরকম অবস্থায় আপনি বিক্ষুদ্ধ মনে বাসায়
ফিরলেন।
বাসায় ফেরার পর আপনি আর কাউকে না পেয়ে বেচারী স্ত্রীর ওপর মনের
ঝাল ঝাড়লেন। আপনার ছেলে মেয়েরা আপনার আচরণ দেখে ভাবলো, বাবা তো নয় যেন এক
আজরাইল বাসায় ফিরেছে। তারা আপনার কাছে না ঘেঁষে ভয়ে পালিয়ে বাঁচলো। এদিকে
আপনার স্ত্রী আপনার জন্যে সারাদিন খেটে যে রান্নাবান্না করলো, সেই
রান্নাবান্নার ছোট-খাটো স্বাভাবিক ত্রুটিতে আপনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু
করলেন, কিংবা ঘরদোর হয়তো বাচ্চারা অগোছালো করে রেখেছে, কিংবা তারা
চেঁচামেচি করছে-যাই হোক না কেন আপনি যদি এসব অজুহাতে আপনার স্ত্রীর সাথে
দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী থাকতে পারে! আপনি নিজেই
আপনার সংসারকে দোজখে পরিণত করলেন।
আপনার এই আচরণ মোটেই অভিভাবক সুলভ নয়,
বরং একজন অত্যাচারী স্বৈরাচারের মতো। আপনার মতো স্বৈরাচারের শোষণে আপনার
পুরো পরিবার অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে। আর আপনার স্ত্রী যে তার
স্বামীকে দেখামাত্রই খুশী হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে আপনার চেহারা দেখা মাত্রই
বিরক্ত হয়ে উঠবে। আপনার সঙ্গই তার কাছে বিষময় মনে হবে। ধীরে ধীরে আপনার
স্ত্রী আপনার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইবে। বাচ্চাদের কারণে তা অসম্ভব হলে ঘৃণা
করতে শুরু করবে।
এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি আপনার হবে, তাহলো আপনার এই
আচরণের প্রভাব ছেলেমেয়েদের মনে ব্যাপকভাবে পড়বে। ছেলেমেয়েরা ধীরে ধীরে
মানসিকভাবে এতটাই জটিল বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে যে, তারা আপনার চেয়েও
ভয়ঙ্কর কাজ শুরু করতে পারে। অপরাধ জগতে যারা প্রবেশ করে, তাদের পারিবারিক
ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখলে এই জটিল মানসিকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে।
যার মূল কারণ আপনারই রূঢ় ও ভারসাম্যহীন আচরণ। আপনার সাময়িক অসহিষ্ণুতা
কতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা একবার ভেবে দেখুন।
সর্বোপরি
একটা বিষয় আপনার সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করা উচিত, তাহলো যেই দুর্ঘটনার
মুখোমুখি হওয়ার কারণে আপনি রূঢ় আচরণ শুরু করলেন, সেই ঘটনার জন্য আপনি,
আপনার স্ত্রী কিংবা ছেলেমেয়েরা কী দায়ী? মোটেই না। ফলে নিরপরাধে আপনার
পরিবারের সদস্যদের সাথে নির্দয় আচরণ করা কি অন্যায় নয়? বুদ্ধিমানের কাজ
হলো সবকিছুকে ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলা করা। ধৈর্য্যহারা না হয়ে নিজের প্রতি
নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কাজকর্ম সেরে ধীরে সুস্থে দুর্ঘটনার কথাটি আপনার
স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সামনে তুলে ধরলে তারা বরং কষ্টটিকে
আপনার সাথে ভাগ করে নেবে। এতে সবাই কষ্টের অংশীদার হলো।
অন্যদিকে আপনাকে
কতোভাবে যে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করবে, তাতে আপনার কষ্টকে আর কষ্টই মনে হবে
না। আর আপনার সন্তানরা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। প্রতিদিন তারা
অপেক্ষায় থাকবে কখন আপনি বাসায় ফিরবেন। ঠিকমতো আপনি পৌঁছলেন কিনা এ
ব্যাপারে তারা সদা উদ্বিগ্ন থাকবে।
যার ফলে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। তাই
কোন সমস্যার মোকাবেলায় উগ্রতা পরিহার করে ঠান্ডা মাথায় সামাধান করার
চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সাথে বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে হাসিখুশী থাকার
চেষ্টা করুন। সুন্দর আচরণ করার চেষ্টা করুন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)
এটাকে ঈমানের নিদর্শন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দর
আচরণ করে, তার ঈমান অধিকতর পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যে
তার নিজ পরিবারের সাথে সুন্দর আচরণ করে। রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, সুন্দর
আচরণের চেয়ে শ্রেয়তর কোন কর্ম নেই।
ইসলামের
জীবনযাপন পদ্ধতি সব সময়ই সুশৃঙ্খল এবং বৈজ্ঞানিক। ফলে তা মানুষের জন্য
কল্যাণকর। কিন্তু এই কল্যাণকে আমরা অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতায়
যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারছি না বলেই কল্যাণবিমুখ হয়ে হতাশায় ভুগি।
আমাদের একটা অভ্যাস অজান্তেই গড়ে ওঠেছে, তাহলো না জেনে না বুঝে
পাশ্চাত্যের ভেঙ্গে পড়া পরিবার কাঠামোর অনুসারী হয়ে পড়া। তাদের উশৃঙ্খল ও
অযৌক্তিক জীবনযাপন পদ্ধতিকে ‘আধুনিক' আখ্যা দিয়ে আমরা যখন তার চর্চা শুরু
করে দেই, তখনই ইসলামের জীবন পদ্ধতি আমাদের সামনে সেকেলে হয়ে দাঁড়ায়।
অথচ
পাশ্চাত্যের এই আধুনিকতার দাবীদাররা বহু আগেই তাদের জীবন চর্চার ভ্রান্তির
ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছে। তাদের উশৃঙ্খল জীবন পদ্ধতি কেবল পরিবার নয়
সমাজ থেকে রাষ্ট্রপতি সর্বত্রই এক দুর্বিসহ বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। পরিবার
কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তারা এখন হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করছে। অথচ ইসলাম দেড়
হাজার বছর আগে যে পারিবারিক শৃঙ্খলা বিধান করে গেছে, তার আজো পরম সত্যের
আলোকবর্তিকা হিসাবে পৃথিবীকে আলো বিকিরণ করে যাচ্ছে। কিয়ামত পর্যন্ত
ইসলামের এই জীবন বাস্তবতা অক্ষুন্ন থাকবে।
তাই আমাদের উচিত ভেঙ্গে পড়া
সমাজের ভঙ্গুর আদর্শের চাকচিক্যকে আধুনিকতার মোড়কে বন্দী করে নিজেদেরকে
বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত না করা। ইসলামের শ্বাশ্বত আদর্শে অবগাহিত হয়ে তারি
আলোকে পারিবারিক জীবনকে সাজিয়ে তুলে ইহকাল এবং পরকালীন সুখ-শান্তির পথ
সুগম করা। পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি কিংবা অশান্তি বা দুর্ভোগ এসবের অধিকাংশই নির্ভর করে
নারীর ওপর। নারী ইচ্ছে করলে ঘরকে বানাতে পারে বেহেশত, আবার সে-ই ঘরকে
পরিণত করতে পারে জ্বলন্ত দোযখে। একইভাবে নারী তার স্বামীকে সাফল্যের
সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে যেমন সাহায্য করতে পারে, তেমনি খুব সহজেই
স্ত্রী পারে স্বামীকে দুর্ভাগ্যের অতল গহ্বরে পৌঁছে দিতে। নারীর এই বিশেষ
ক্ষমতা বা গুন আল্লাহর দান।
অতএব গুনের প্রয়োগ যথার্থ হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।
অর্থাৎ নারীকে অবশ্যই তার এই গুন বা যোগ্যতাকে স্বামী ও সংসারের কল্যাণে
ব্যবহার করতে হবে। রাসূলে কারীম (সাঃ) বলেছেন, "যদি কোন মহিলা তার স্বামীর
প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে সে আল্লাহর প্রতি তার কর্তব্যকেও
পালন করেনি।" কতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এটি। পাশ্চাত্য চিন্তার অনুসরণে
তথাকথিত আধুনিক নারীদের দায়িত্ববোধে এ ব্যাপারটি আপাত দৃষ্টিতে হাস্যকর
বলে মনে হলেও পরিণতিতে তার চরম সত্যের রূপ পরিগ্রহ করে।
যেসব নারী
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে স্বামীর প্রতি নিজস্ব দায়িত্ব ও
কর্তব্যের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ে, তাদের সংসার, পরিবার তথা জীবনের
সুখ-শান্তি যে সুদূর পরাহত, তার প্রমাণ পাশ্চাত্যের ভেঙ্গে পড়া পরিবার
কাঠামো। হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, "একজন স্ত্রীলোকের জিহাদ হলো তার স্বামীকে
ভালো রাখা।" এই ভালো রাখতে গেলেই স্ত্রীর ওপর বিচিত্র দায়িত্ব বর্তায়। এই
দায়িত্ব পালনে স্ত্রীকে হতে হয় চটপটে ও চালাক-চতুর। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক
অনুভূতি, সুরুচীবোধ এবং অকৃত্রিম ও অকপট আচরণের মাধ্যমে স্ত্রী তার
স্বামীকে ভালো অর্থাৎ কাঙ্খিত লক্ষ্য নিয়ে যেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর
প্রাথমিক কাজ হবে স্বামীর হৃদয়কে জয় করা এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর
ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাস জাগিয়ে তুলে তাকে খারাপ কাজ থেকে কৌশলে ফিরিয়ে
রাখার চেষ্টা করা। ভালোবেসে পৃথিবী জয় করা যায়। ভালোবাসা বন্ধুত্বের
সম্পর্ককে দৃঢ় করে। প্রতিটি মানুষই ভালোবাসা প্রত্যাশা করে। কারণ
ভালোবাসাহীন মানুষ বড়ো একা-নিঃসঙ্গ এমনকি পরিত্যক্ত। তাই একজন স্ত্রী
হিসাবে স্বামীকে যতোবেশী ভালোবাসা যাবে, ততোই পারস্পরিক সম্পর্ক হয়ে উঠবে
মধুর ও সুখের।
কারণ ভালোবাসা এমন একটি পরস্পরমুখী সম্পর্ক যা দুটি হৃদয়কে
একত্রিত করে দেয়। এই ভালোবাসার প্রকাশ বিচিত্র। ভালোবাসা কেবল প্রকাশ্যে
নয়, আন্তরিক হতে হবে। ঘরে-বাইরে সবখানেই তার অভিব্যক্তি হতে হবে অকৃত্রিম।
বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবার সামনেই স্বামীর প্রতি
ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ স্বামীর প্রশংসা ও সৎগুনাবলীর ইতিবাচকতা তুলে
ধরতে হবে। সব মিলিয়ে স্বামীর সাথে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে হবে।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না উঠলে পরস্পরের প্রতি
হৃদয়ের টান অনুভূত হবে না। আর দুটি হৃদয় যদি অভিন্ন না হয়, তাহলে সেখানে
ভালোবাসা থাকে না। ভালোবাসা না থাকলে সংসারে বিরাজ করে অশান্তি।
অথচ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন ও আকর্ষণকে
শান্তি ও কল্যাণের উৎস হিসাবে প্রকাশ করেছেন এভাবে-"এবং তাঁর
নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে
সঙ্গীনি তৈরী করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের
মধ্যে পারস্পরিক দয়া ও ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল লোকদের জন্যে এতে
অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।" ইমাম রেজা (আঃ) বলেছেন, ‘কোন কোন স্ত্রীলোক
তাদের স্বামীদের জন্যে আশীর্বাদস্বরূপ- যারা তাদের ভালোবাসা ও অনুগত্যকে
প্রকাশ করে।'
মানুষের
পারিবারিক জীবন একটা বহতা নদীর মত। নদীতে কখনও চর জাগে, কখনও ঝড় ওঠে। আর
নিত্য জোয়ার ভাটাতো রয়েছেই। এই বিচিত্র উত্তাল তরঙ্গের মাঝে যথার্থভাবে
টিকে থেকে নিজস্ব গন্তব্যে পৌঁছুতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা।
ইসলাম এ ক্ষেত্রে যে যুগান্তকরী নির্দেশনা দিয়েছে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে
সকল মানুষেরই জীবন-কল্যাণের জন্যে সুপ্রযুক্ত। ইসলামের এই জীবন বিধানের
আলোকেই আমরা পরিবারের প্রধান দুটি স্তম্ভ স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক
কর্তব্য নিয়ে কথা বলছিলাম।
মানুষকে
সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। ফলে মানুষের বাহ্যিক যেই রূপ, তা তার নিজস্ব নয়, তা
আল্লাহরই দান। তাই এই রূপ নিয়ে কারো গর্ব-অহঙ্কার করার কিছু নেই। অথচ
দুঃখজনক ব্যাপার হলো অনেক সুন্দরী মহিলাই তাদের রূপের অহঙ্কারে বুঁদ হয়ে
এমন সব অযৌক্তিক ও অপ্রত্যাশিত আচরণ করে বসেন, যা পারিবারিক কাঠামোকে
নড়বড়ে করে দেয়। স্
বামী যদি এরকম কোন সুন্দরী স্ত্রীর রূপশ্রীর তুলনায়
পিছিয়ে থাকেন, তাহলে ঐ স্ত্রী কথায় কথায়, উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে স্বামীকে
এমন অবমাননাকর ভাষায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকেন, যাতে স্বামীর জীবন হয়ে
পড়ে দুর্বিসহ। স্ত্রীর কাছে উপেক্ষিত হয়ে সংসারের প্রতিই একরকম উদাসীন হয়ে
পড়েন হতভাগ্য ঐ স্বামী। যার ফলে সংসার আর সংসার থাকে না, সংসার হয়
মোটামুটি একটা অশান্ত দোযখে।
এখন কথা হলো, স্বামী যদি স্ত্রীর কাছ থেকে
নিরন্তর উপেক্ষার যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে, তাহলে সংসারতো আর টিকবে না। তাই
জীবনের প্রয়োজনে পারিবারিক শৃঙ্খলার প্রয়োজনে, স্ত্রীর উচিত গভীরভাবে
চিন্তা-ভাবনা করে সুষ্ঠু একটা সিদ্ধান্ত নেয়া। ইসলাম যেকোন রকম সিদ্ধান্ত
নেয়ার স্বাধীনতা তাকে দিয়েছে।
তবে স্ত্রী যদি অন্যায়ভাবে কোন সিদ্ধান্ত
নেয়, তাহলে সেজন্যে পরকালে তাকে আল্লাহর দরবারে জবাবদীহি করতে হবে। যাই
হোক স্ত্রীর যেহেতু সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রয়েছে, সেহেতু স্বামীর সংসারে
অবস্থান করে স্বামীকে অযথা উৎপীড়ন করার কোন মানে হয় না। কারণ কোন স্বামীই
স্ত্রীর কাছ থেকে দুর্বিনীত আচরণ প্রত্যাশা করে না।
স্বামীর সংসারে বসবাস
করার অন্যতম দাবী হলো-দুটি জীবনকে একই স্রোতে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা
চালানো। স্বামীর প্রতি সশ্রদ্ধ ভালোবাসা প্রদান স্ত্রীর একটা প্রাথমিক
দায়িত্ব। এটি হলো বিশাল সংসার বৃক্ষের বীজ। শ্রদ্ধা মেশানো ভালোবাসার মধ্য
দিয়ে অনাবিল শান্তির ধারা বয়ে যায় জীবনে, সংসারে। স্বামীর প্রতি এই
শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন স্ত্রীকে কখনো খাটো করবে না বরং উন্নততর জীবনে
প্রবেশের যুদ্ধে স্ত্রীর এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা স্বামীকে আরো শক্তি ও
উৎসাহ জোগাবে।
কথার
ভেতরে কথা বলা মানুষের একটা বদ-অভ্যাস। এই বদ-অভ্যাস ভদ্রতা বিরোধী।
ব্যক্তিগত আচার-আচরণে এই গুনটিকে পরিহার করতে না পারলে ব্যক্তিত্বের প্রতি
আঘাত আসতে পারে। ছোট-বড় সবার ক্ষেত্রেই এ বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে।
স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও মৌলিক এই আচরণবিধিটি অনুসরণ করা উচিত।
স্বামী
যখন কোন কথা বলবে, তখন হুট করে তার কথার ভেতরে অন্যকোন প্রসঙ্গ টানা ঠিক
হবে না। স্বামীর সাথে কথা বলার সময় বিনীতভাবে উচ্চকণ্ঠ পরিহার করা
মঙ্গলজনক। এই বিনীত শ্রদ্ধাবোধের কারণে স্বামীও স্ত্রীর প্রতি সম্মানজনক
আচরণ করতে বাধ্য হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ফলে ঐ পরিবারে শান্তির
সোনালী পরিবেশ বিরাজ করবে-যা সবারই আন্তরিক প্রত্যাশা। শ্রদ্ধা-সম্মান হতে
হবে আন্তরিক। কৃত্রিম শ্রদ্ধা বা লোকদেখানো শ্রদ্ধায় কোন কল্যাণ নেই।
নিজে যেমন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধেয় মনোভাব পোষণ করবেন, তেমনি
ছেলে-মেয়েদেরকেও বলতে হবে যেন বাবাকে শ্রদ্ধা করে। এটাই আন্তরিকতার
বহি:প্রকাশ। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা পাড়া-প্রতিবেশীর সামনে
স্বামীকে হেয় প্রতিপন্ন করে কথা বলা ঠিক নয়। সাময়িকভাবে তারা হয়তো আপনার
বক্তব্যের প্রতি সমর্থন যোগাবে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে তারাই আপনার
সমালোচক হয়ে উঠবে। আর দুষ্টেরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আপনাদের সম্পর্কে
টানাপোড়েন সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাবে। তাই স্বামীর ভালোগুনগুলোই তুলে
ধরুন, এতে কল্যাণ রয়েছে।
মোটকথা
স্বামীর প্রতি মনযোগী হোন, তার ভালো লাগা মন্দ লাগার ব্যাপারগুলোকে
আবিস্কার করার চেষ্টা করুন, অমায়িক ব্যবহার করুন। সবসময় হাসিখুশী থাকার
চেষ্টা করুন। হাসিমুখে কথা বলার চেষ্টা করুন।
আপনার ক্লান্ত পরিশ্রান্ত
স্বামী মানুষটিকে কাজের শেষে এক বুক অবসাদ নিয়ে যখন ঘরে ফেরে, তখন আপনার
সুন্দর একটু হাঁসি তার সকল ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে। দরজায় কলিংটা
বাজতেই আপনি যদি গোমড়া মুখে দরজা খুলে দিয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেন, তাহলে
স্বামী মানুষটির ক্লান্তির ওপরে বাড়তি একটা টেনশন বা উদ্বেগ যুক্ত হবে।
ফলে এরকম আচরণ না করে তার প্রতি সদয় ও বিনম্র আচরণ করুন।
জগত সংসারে এমন
অনেক নারী রয়েছেন, যারা তাদের অভিলাষ মেটাতেই ব্যস্ত থাকেন। এদের অধিকাংশই
পরশ্রীকাতর হয়ে থাকেন। প্রতিবেশীদের ঘরে এটা আছে, সেটা আছে আমাদের কেন
নেই-আমাদের অবশ্যই সেটা থাকতে হবে। স্বামীর আয় রোজগারের কথা না ভেবেই এরকম
চিন্তা করেন। স্বামী যদি তাঁর আর্থিক সমস্যার কথা জানান, তাহলে উল্টো বলে
বসেন-অন্যদের থাকলে তোমার কেন নেই, তুমি একটা বুদ্ধু, হাবা ইত্যাদি।
এতে
করে স্বামী পুরুষটি ভীষণভাবে মর্মাহত হন, হতাশায় ভোগেন। সব সময় তার মনে
স্ত্রীর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয়টি কাজ করে। স্ত্রীর কাছে নিজেকে নতজানু
মনে হতে হতে সকল আগ্রহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেন-যার পরিণতি খুবই
অপ্রত্যাশিত।
ফলে স্ত্রীদের উচিত পরশ্রীকাতরতা পরিহার করে স্বামীর আয়
রোজগারে সন্তুষ্ট থেকে এমনভাবে আচরণ করা, যাতে স্বামী মানুষটি নিজে থেকেই
অনুভব করে যে, "আমার স্ত্রীকে যদি অমুক জিনিসটা কিনে দিতে পারতাম।" একদিন
ঠিকই দেখা যাবে তার অনুভূতি বাস্তব রূপ পেয়েছে। স্ত্রীও যে এতে মহা খুশী
হবে-তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই আত্মতৃপ্তি আর সন্তুষ্টির ফলে দু'জনের
পারস্পরিক ভালোবাসা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে। আর সংসার ভরে উঠবে সুখের সুরভিত
আমেজে। সবশেষে ইমাম জাফর সাদেক (আঃ)এর একটি বাণী উদ্ধৃতি করছি। তিনি
বলেছেন, "সেই রমনী সৌভাগ্যবতী ও সফল যে তার স্বামীকে শ্রদ্ধা করে এবং তাকে
কখনো খাটো করে না।"
আপনার
সংসারটা কি সত্যিই সোনালী নীড় ? এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর যদি মনে মনে ‘না'
বা নেতিবাচক হয়, তাহলে এ আলোচনা আপনার জন্যে। আর প্রশ্নের জবাবটি যদি
‘হ্যাঁ' হয়, তাহলেও আলোচনা আপনার জন্য, কারণ এ আসর আপনাকে ব্যক্তিগত
দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এছাড়া যারা এখনো
সংসার জীবনে প্রবেশ করেননি, তবে করতে যাচ্ছেন, এ আলোচনা তাদের জন্য-কারণ এ
আসর আপনাকে পারিবারিক কাঠামোয় প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে যথার্থ
দিক-নির্দেশনা দেবে।
রাসূলে
পাক (সাঃ) বলেছেন, "যে স্ত্রী তার স্বামীকে জিহবা দিয়ে তাড়না করে, তার
প্রার্থনা আল্লাহ শোনেন না, যদিও সে প্রতিদিনই রোজা রাখে, প্রতি রাতেই
নামাজের জন্যে জাগে, কোন দাস-দাসীকে মুক্ত করে দেয় এবং আল্লাহর পথে তার
সম্পদ ব্যয় করে। মুখরা স্ত্রী যে তার স্বামীকে এভাবে কষ্ট দেয়, সে-ই দোযখে
প্রথম প্রবেশ করবে।"
আসলে
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কটি এতো আন্তরিক ও ভালোবাসার যে, সেখানে
সামান্যতম বিচ্যুতি দেখা দিলে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বিরাগ এসে
ভর করে। আর এই বিচ্যুতির সূচনা ঘটে আচার-আচরণ ও কথা-বার্তার মাধুর্যহীনতা
থেকে। সবারই উচিত সব সময় হাসিখুশী থাকা, আনন্দমুখর থাকা। নম্র, ভদ্রভাবে
হাসিমুখে কথা বললে অনেক কঠিন পরিস্থিতিও খুব সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব।
উচ্চাভিলাষী নারীদের মধ্যে অনেক সময় অতৃপ্তির অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়।
এই অভিব্যক্তি তাদের স্বামীদের মনোপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীরা
সাধারণত স্ত্রীদের সন্তুষ্টি, সংসারের কল্যাণ এসবের জন্যে নিজেদের সকল
শ্রম ও মেধা ব্যয় করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও পেশাভেদে উপার্জনগত
তারতম্য থাকতেই পারে। এই তারতম্যের বিষয়টিকে যদি ইতিবাচক বা সমার্থক হিসাবে
ধরে নিয়ে মেনে নেয়া যায়, তাহলে কিন্তু আর সমস্যা থাকে না। কিন্তু যখনি তা
অন্যদের সাথে তুলনা করা হয়, তখনি দেখা দেয়া বিরুপতা।
তাই স্বামী-সন্তান,
পরিবার-সংসারের বৃহত্তর স্বার্থে সামর্থ অনুযায়ী বিবেচনা করাই উত্তম।
স্বামীর ব্যাপারেও স্ত্রীদের সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। কর্মক্লান্তি
নিয়ে তিনি যখন বাসায় ফেরেন, তখন তার সাথে আন্তরিক আচরণ করা উচিত। কোন
অভাব-অভিযোগ বা নেতিবাচক বিষয় হুট করেই তার সামনে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
স্বামী বাসায় ফেরার পর স্ত্রীদের উচিত এমন আচরণ করা, যাতে বোঝা যায় যে,
তার আগমনে আপনি ভীষণ খুশী ও আনন্দিত হয়েছেন। কিংবা এমন বোঝা যায় যে, আপনি
তার জন্যেই এতোক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। ধীরে ধীরে অবস্থা বুঝে সংসার, সন্তান ও
ব্যক্তিগত সকল বিষয়ে আলাপ করুন। সমস্যা সমাধানে পরস্পরকে সহযোগিতা করাই
স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য।
ইমাম
সাদিক (আঃ) বলেছেন, " আনন্দময় জীবনের চাইতে আর কোন জীবনই কাম্য নয়"। এই
উক্তির সত্যতা ও যথার্থতা অনস্বীকার্য। দেখা গেছে, অনেক ধনী লোক তার সকল
সম্পদ নিয়েও অশান্তিতে রয়েছেন। তার কারণ ধন-সম্পদের প্রতিযোগিতায় তারা যতো
আন্তরিক, সুখ-শান্তির অন্বেষায় ততোটা নন। আবার তার বিপরীতে দেখা যায়,
অভাব-অনুযোগ সত্ত্বেও বহু দম্পতি সুখে-শান্তিতে দিনাতিপাত করে যাচ্ছে।
ফলে
এ কথাটি বুঝতে হবে যে, সম্পদের প্রাচুর্যে শান্তি নেই, শান্তি হলো মনে।
মনের প্রশান্তিই সাংসারিক ও দাম্পত্য জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি। তাই সম্পদের
প্রতিযোগিতায় অন্ধ হয়ে অন্যদের সাথে তুলনা করে পরশ্রীকাতরতায় না ভুগে যা
আছে তাই নিয়ে আনন্দ উপভোগ করাই হবে যুক্তিযুক্ত। মনে রাখতে হবে যারা
প্রাচুর্যের সন্ধানেরত, তাদের প্রত্যাশা সীমাহীন। কোনভাবেই এই প্রত্যাশা
মিটবে না। আর সামান্যতম কম প্রাপ্তি বা অচরিতার্থতায় প্রাচুর্যকামীরা
ভেঙ্গে পড়েন। এ থেকেই জন্ম নেয় হিংসা, রাগ, বদমেজাজসহ সমূহ চারিত্রিক অসৎ
গুনাবলী। কোন কিছুতেই তখন আর মনের তৃপ্তি মেটেনা। মেজাজ সব সময় তিরিক্ষি
হয়ে থাকে।
রাসূলে কারীম (সাঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, মানুষের বদমেজাজ ও
মনোভাব স্থায়ী যন্ত্রণা ও ভোগান্তির সৃষ্টি করে।" অথচ সদ্ব্যবহার, সদাচরণ,
সামর্থে-তুষ্টির মনোভাব মানুষকে সর্বাবস্থায়ই সন্তুষ্টিই রাখে। আর এই
সন্তুষ্টিই হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি। ইমাম সাদিক (আঃ)
যথার্থই বলেছেন, " সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা সদ্ব্যবহারকারীদের জন্যে
জিহাদের সমান পুরস্কার রেখেছেন। তার প্রতি দিনে ও রাতে আল্লাহর রহমত
বর্ষিত হবে।"
স্বামীদের
উপর সংসারের একটা বিশাল চাপ ও দায়িত্ব থাকে। এ দায়িত্ব পালনে সবসময় হয়তো
তিনি সফল না-ও হতে পারেন। তাই বলে তার ব্যর্থতার জন্য তাকে বকা-ঝকা করা
কিন্তু ঠিক নয়। বরং তাকে সান্ত্বনা ও প্রবোধ দেয়া উচিত। কারণ জীবন
নির্বাহের বোঝা বহন করার জন্য কিংবা বোঝা বহন করার পর, এমন একজন
সহানুভূতিশীল বন্ধু প্রয়োজন যে তার প্রতি মনোযোগ হবে। তার কাজ-কর্মের
ব্যাপারে ধন্যবাদ দেবে, উৎসাহ যোগাবে। এই কাজগুলো যার পক্ষে সবচেয়ে বেশী
সম্ভব তিনি হলেন তার স্ত্রী। স্ত্রীর বন্ধুত্বসুলভ সান্নিধ্য ও ভালোবাসাই
স্বামীর সকল ক্লান্তি, অবসাদ ও দুর্ভাবনা দূর করে দিতে পারে সহজেই।
একটি
হাদীসে আছে, "নিজের ত্রুটিকে উপেক্ষা করে অন্যের ত্রুটি খুঁজে বেড়ানোর মতো
খারাপ কিছু আর নেই।" মহানবীর এই বাণীটি স্মরণে থাকার পরেও অনেকেই কিন্তু
এই খারাপ বিষয়টির চর্চা করে থাকে। একথা অনস্বীকার্য যে, মহাপুরুষ ছাড়া কোন
মানুষই ভুল ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। ফলে আরেক জনের ভুল-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানোটা
আত্ম-প্রবঞ্চনার শামিল। বিশেষ করে এই প্রবণতাটি যদি স্বামী-স্ত্রীর
ক্ষেত্রে দেখা দেয়, তাহলে পারিবারিক বিপর্যয় দেখা দেয়াটাই স্বাভাবিক। তাই
পারস্পরিক ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি খুঁজে না বেড়িয়ে বরং ভালো গুণগুলোর প্রতি
দৃষ্টি দিন এবং সেগুলোর জন্যে প্রশংসা করুন।
তবেই আপনার সংসার জীবন হয়ে
উঠতে পারে সত্যিই এক ‘সোনালী নীড়'। মনে রাখবেন দোষ-ত্রুটি খুঁজতে গেলেই
শয়তান প্ররোচিত করবে। আর শয়তানের প্ররোচনা মনের ভেতরে জাগাবে সর্বনাশী
চিন্তা-ভাবনা। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণায় না পড়ে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা
করুন এবং পরস্পরের মতামত ও ভালো লাগা-মন্দ লাগার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন।
ধরে নেয়া
যাক, কোন কোন স্বামীর সত্যি-সত্যিই কিছু প্রাকৃতিক দুর্বলতা রয়েছে। এই
দুর্বলতাগুলোকে স্ত্রীদের কেউ কেউ অনেক সময় ত্রুটি হিসেবেই ধরে নেয়ার
চেষ্টা করে থাকেন-এটা ঠিক নয়, বরং যেসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা বা সারিয়ে
তোলা সম্ভব, সেগুলো থেকে মুক্তি লাভের জন্যে স্ত্রীদের উচিত স্বামীকে
সহযোগিতা করা। নাক ডাকার জন্যে কিংবা নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধের জন্যে যদি
সংসার ভাঙ্গতে হয়, তাহলে এরচে আর দুঃখজনক ঘটনা কী হতে পারে? অথচ এগুলো
মানুষের চিকিৎসাযোগ্য সাধারণ সমস্যা। এই স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোকে বহু
গৃহিনী অন্যের সাথে তুলনা করে প্রকাশ্যেই বলে বেড়ান আমার যদি এখানে বিয়ে
না হতো তাহলে আজ আমাকে এই কষ্ট ভোগ করতে হতো না।
কিন্তু এই কথাটি তারা
ভাবতে ভুলে যান যে, তাদের স্বামীর যে ত্রুটিটি নেই, সেই ত্রুটিটি অন্য
পুরুষটির মধ্যে রয়েছে? ফলে ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো বা অন্যের স্বামীর সাথে
তুলনা করে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগা খুবই দুঃখজনক। এই ধরণের প্রবণতা থেকে
স্ত্রীদের দৃষ্টি চলে যায় ঘরের বাইরে। আপন ঘরকে তখন মনে হয় নরক, আর
স্বপ্নিল দৃষ্টিতে দেখেন স্বর্গীয় সুখ। অথচ নদীর ওপারে যে স্বর্গসুখ নেই
বরং তা-ই যে জ্বলন্ত নরক, তা ভুক্তভূগীরাই জানেন।
বিয়ের পরে
স্বামীর ঘরই হলো স্ত্রীর জন্যে বেহেশত। এই বেহেশতে বসে অন্যদের নিয়ে
ভাবলে কিংবা তাদের সাথে আপন স্বামীকে মেলানোর চেষ্টা করলে বহু অসঙ্গতি
খুঁজে পাওয়া যাবে। তখন যদি স্ত্রীরা এভাবে ভাবতে থাকে-আহা! আমার বিয়েটা
যদি অমুকের সাথে হতো, তাহলে কতোই না ভালো হত! কিংবা কী চেয়েছিলাম, আর কী
পেলাম! ইত্যাদি। তাহলে আপনাদের মনে অজান্তেই দেখবেন স্বামীর সাথে একটা
মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছে। আর স্বামী যদি কোনভাবে ঐ দূরত্বের কারণ
টের পান, তাহলে আপনাদের স্বামীরাও আপনাদের ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
এমনকী দ্বিতীয় বিয়ে করার কথাও ভাবতে পারেন।
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কর্মজীবনে বিচিত্র পেশায় নিয়োজিত। সব পেশাই কিন্তু সবার কাছে সমানভাবে পছন্দনীয় নয়। জীবিকার তাড়নায় তাই অপছন্দনীয় হলেও কোন না কোন পেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেই হয়। পেশা এমন কোন ব্যাপার নয় যে, হুট করেই গায়ের জামা-কাপড়ের মতো পরিবর্তন করে ফেলা যায়।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোতে তো
পেশা বা চাকুরী প্রাপ্তি সোনার হরিণের মতো দুর্লভ। সেক্ষেত্রে তো পছন্দের
প্রশ্নটিই অবান্তর। এ রকম ক্ষেত্রে কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর পেশাগত
ব্যাপারে অপছন্দের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে, তখন স্বামী পুরুষটির কী অবস্থা
দাঁড়ায় একবার ভাবুন তো! স্বামী যদি চাকুরী ছেড়ে দেয়, তাহলে সংসার অচল হয়ে
যাবে। অন্যদিকে চাকুরীটি করলে স্ত্রীর বিষন্ন মুখ দেখতে হবে। তাহলে এর
সমাধানটা কী হবে? হ্যাঁ এর একটাই সমাধান। তাহলো স্বামীর পেশার সাথে নিজেকে
মানিয়ে নেয়া। তবে স্ত্রীর পছন্দের পেশায় যদি যোগ দেয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে
ভিন্ন কথা।
এ ক্ষেত্রে স্বামী তার ব্যক্তিত্বের বিষয়টি বিবেচনা করে
গ্রহণযোগ্য মনে করলে অবশ্যই স্ত্রীর পছন্দের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।
কিন্তু স্ত্রীর পছন্দের পেশায় যদি যাবার সুযোগ না থাকে, তাহলে স্ত্রীদের
উচিত সহনশীল হওয়া, ধৈর্যশীল হওয়া, বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা
করা। হুট করেই স্বামীর সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করা কিংবা তাকে
তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে চলা মোটেই উচিত নয়। মনে রাখতে হবে স্বামী যে পেশাতেই
নিজের শ্রম দিচ্ছেন তা সংসারের জন্যেই।
তো পেশা
পরিবর্তন যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতির সাথে
নিজেকে মানিয়ে নেয়াই যুক্তিযুক্ত। এতএব স্বামীকে ভর্ৎসনা না করে বরং তাঁর
সাথে সহযোগিতা করুন। তাঁর পরিশ্রমকে আন্তরিকভাবে উপলদ্ধি করার চেষ্টা
করুন। কাজ শেষে তিনি যখন বাসায় ফেরেন, তখন তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানান। এ
রকম আচরণের ফলে স্বামী, স্ত্রীর প্রতি অনেক বেশী অনুরক্ত হবেন।
যার ফলে
পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষেই স্বামী, স্ত্রীর কাছে ছুটে আসতে চাইবেন। এরকম
সম্পর্ক স্থাপিত হলে সংসার সত্যিকার অর্থেই সোনালী নীড়ে পরিণত হবে। আর
বিপরীত আচরণের ফলে সংসারটি ভেঙ্গে যেতে পারে। কোন স্ত্রী নিশ্চয়ই তাঁর
স্বপ্নের সংসারটিকে ভাঙ্গতে চান না। যদি কেউ এর ব্যতিক্রম চিন্তা করে
থাকেন, তাহলে তা-ও নিশ্চয়ই সুখের আশায়! আর হ্যাঁ, একথা সর্বজনবিদিত সত্য
যে, সংসার ভেঙ্গে কখনোই সুখ পাওয়া যায় না, বরং সংসার গড়েই সুখের একটা
পরিবেশ তৈরী করা যেতে পারে। তাই সংসারের স্বার্থে, সুখের স্বার্থে,
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মধুর সম্পর্ককে অটুট রাখতে বুদ্ধিমত্তার সাথে
পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন-এটাই একান্ত প্রত্যাশা।
একটি
সুশৃঙ্খল পরিবার গঠনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ঔদার্য, সহনশীলতা, ধৈর্য ও
ছাড় দেয়ার প্রবণতা যে কতো গুরুত্বপূর্ণ তা নিশ্চয়ই আমাদের আলোচনা থেকে
স্পষ্ট হয়েছে। পারিবারিক জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই মনে রাখতে হবে যে,
শৃঙ্খলা বিধানই হলো মূল লক্ষ্য, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি নয়। বুদ্ধিমত্তার সাথে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে দূরদর্শিতার পরিচায়ক। তাৎক্ষণিকতার আশ্রয়
নিয়ে বোকামী করা মোটেই ঠিক নয়।
ফুলের
বুকে যদি মৌমাছি বসে, তাহলে সেই ফুল হয়ে ওঠে মধুময়। একই ফুলে যদি বোলতা বা
ভীমরুল বসে, তাহলে কি সেই ফুল বিষময় হয়ে উঠবে? না, ফুল তার নিজস্ব
বৈশিষ্ট্যেই অটুট থাকে। পার্থক্য শুধু এই যে, যে-যার প্রয়োজনীয় ও কাঙ্খিত
জিনিস চেছে নেয়। ফলে, ফুলের কোন দোষ নেই। দোষ হলো গ্রহীতার। উদাহরণ এ জন্য
দেয়া হলো যে, যে কোন পরিবেশেই আপন প্রত্যাশার বাস্তবায়ন সম্ভব। যদি সেই
প্রত্যাশা হয় আন্তরিক।
ধরা যাক আপনার স্বামী গ্রামাঞ্চলে স্থানান্তরিত
হয়েছে। স্ত্রী হিসেবে আপনিও সেই গ্রামে বসবাস করতে গেলেন। সেখানে গিয়েই
দেখলেন যে, শহরের নাগরিক সুবিধা থেকে এই গ্রাম বঞ্চিত। এ অবস্থায় আপনি যদি
তোলপাড় কান্ড শুরু করে দেন, তাহলে কিন্তু আর শান্তির সোনার হরিণ ধরা গেল
না। পক্ষান্তরে এই পরিবেশকেই যদি আপনি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন,
তাহলে
কিন্তু শান্তির একটা সোনালী নীড় এখানে আপনি গড়ে নিতে পারেন। আপনি ভাবতে
পারেন শহুরে অনেক সুবিধা এখানে হয়তো নেই, তবে প্রাকৃতিক যেই অকৃত্রিমতা
এখানে রয়েছে, তা তো শহরে কল্পণাতীত। এখানে আপনি যেই তরতাজা তরী-তরকারী
খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, পাচ্ছেন মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা, তাতো শহরে নেই।
এভাবে ইতিবাচকভাবে ভাবতে পারলে এখানেও সম্ভব শান্তি-সুখের একটি পরিবেশ গড়ে
তোলা। মোটকথা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী জীবনকে নির্ঝঞ্ঝাট এক সহজতা দান করে।
কবি নজরুল যেমন লিখেছেন, ‘জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি, পুষ্পের হাসি।'
ঠিক তেমনি ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে যে কোন বৈরী
পরিবেশ-পরিস্থিতিতেও সানন্দে থাকা যায়। এটি একটি অসাধারণ গুন।
ক্রমোন্নতির পথে এগিয়ে চলা যে কোন মানুষেরই একটা স্বাভাবিক প্রবণতা। আর এই উন্নতি সাধনের জন্যে প্রয়োজন সুদৃঢ় ইচ্ছা ও কঠোর শ্রম প্রদানের সামর্থ। এ দু'য়ের সমন্বয় ও বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজন হয় একটা নেপথ্য অনুপ্রেরণা। যে কোন স্ত্রী তার স্বামীর এই উন্নতির পথকে করে দিতে পারে সুগম। স্ত্রী কেবল এ ক্ষেত্রে সাহায্য কারিণীই নয় বরং একজন যথার্থ গাইড হিসেবে স্বামী পুরুষটিকে নিয়ে যেতে পারেন সাফল্যের শিখরে । পৃথিবীব্যাপী উন্নতি ও কল্যাণের যতো উদাহরণ রয়েছে, সেসবের পেছনে রয়েছে এক-একটি নারীর আন্তরিক প্রেরণা। কবি নজরুল সম্ভবত এজন্যেই বলেছিলেন, পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর ।
তাই আপনার
স্বামীর উন্নতির কোন সম্ভাবনা যদি দেখতে পান, তাহলে তাঁকে উৎসাহিত করুন ।
এই উন্নতি যেকোন ক্ষেত্রেই হতে পারে । কী ব্যবসা-বাণিজ্য, কী পড়ালেখা, কী
গবেষণা, সর্বক্ষেত্রেই আপনি হতে পারেন সাফল্যের অন্যতম সহায়ক । তবে লক্ষ্য
রাখতে হবে উৎসাহিত করতে গিয়ে স্বামীরা অর্থাৎ পুরুষরা সাধারণত নিয়ন্ত্রণ
বা অধীনতা পছন্দ করে না । আর সৃজনশীলতা সবসময়ই স্বাধীনতার সুযোগে বিপথে
চলে না যান । বিপথগামিতা থেকে ভালোবাসা দিয়ে আন্তরিকতা দিয়ে স্বামীকে
ফিরিয়ে রাখতে হবে সুকৌশলে, বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে । রাসূল (সা:) বলেছেন,
স্বামীর যথার্থ যত্ন নেয়াই প্রতিটি নারীর জন্যে জিহাদ স্বরূপ ।
স্বামীর প্রতি লক্ষ্য রাখতে গিয়ে সন্দেহ পরায়ন হয়ে যাওয়াটা ঠিক নয় । মনে রাখবেন সন্দেহ অত্যন্ত ক্ষতিকর একটা রোগ, যা চিকিৎসার অযোগ্য। সন্দেহপরায়ণতা থেকে মারাত্মক পরিণতি দেখা দেয় । স্বামী বা স্ত্রী যেই এই রোগে ভোগে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত । কোনরকম বাদানুবাদ না করে যুক্তিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে বিশ্বাস স্থাপন তথা সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করতে হবে । এক্ষেত্রে পুরুষ বা স্বামীর ব্যক্তিটিকে সহনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে ।
মনে রাখতে হবে স্ত্রী যদি স্বামীকে সন্দেহ করে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে তাহলে
তা ভালোবাসারই লক্ষণ । তাই তার ভালবাসাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা উচিত ।
যেকারণে কোন স্ত্রী তার স্বামীকে সন্দেহ করতে শুরু করে, বিচক্ষণতার
সাহায্যে সেই কারণটি প্রথমে খুঁজে বের করা দরকার । তারপর ঐ সন্দেহ দূর
করার জন্যে যে আচরণ করা সঙ্গত সততার সাথে তা করা উচিত । এ ধরনের সমস্যার
ক্ষেত্রে আপনার সারাদিনের কাজকর্ম নিয়ে স্ত্রীর সাথে গল্প করুন । এমন
আন্তরিকতার সাথে স্ত্রীর সাথে আচরণ করতে হবে যাতে স্ত্রী স্বামীর যেকোন
বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে নির্দ্বিধায় । নারীদের প্রতি এভাবে বিনয়ী ও সহনশীল
আচরণ করলে তারাও তাদের কাজেকর্মে সততার পরিচয় দেবে ।
আপনারা যারা
ইতিমধ্যে ঘর-সংসার শুরু করেছেন, তারা একটি বিষয় লক্ষ্য রাখবেন, তা হলো
যেকোন ব্যাপারে অভিযোগ করার আগে সুনিশ্চিত প্রমাণ থাকা চাই । যতোক্ষণ না
নিশ্চিত প্রমাণ পাচ্ছেন ততোক্ষন পর্যন্ত কাউকে দন্ড দেয়ার অধিকার কারো নেই
। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করলে, সন্দেহ করলে,যাকে অভিযুক্ত করা হলো তার কেমন
লাগবে, সে বিষয়টি নিজেকে দিয়ে একবার পরীক্ষা করুন । বিনা কারণে আপনাকে কেউ
দোষী বললে আপনি কি কষ্ট পাবেন না ! এই কষ্টটি অন্যে দিলে পরিনতি কেমন
হবে, তা নিজেই একবার ভেবে দেখুন ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, ‘হে
ঈমানদারগণ ! অধিকাংশ সন্দেহ পরিহার কর । কারণ নিশ্চিতরূপে কোন কোন
ক্ষেত্রে সন্দেহ হলো পাপ ।' ইমাম সাদিক (আ:) বলেছেন, কোন নিরপরাধ
ব্যক্তিকে মিথ্যা দোষারোপ করার পরিমাপ সুউচ্চ পর্বতের চাইতে ভারী । তাই
স্বামীকে সন্দেহ করার আগে ধীরে সুস্থে একবার ভাবুন ! তারপরও যদি সন্দেহ
থাকে তাহলে ব্যাপারটা নিয়ে স্বামীর সাথে এমনভাবে আলাপ করার চেষ্টা করুন ,
যেন সত্য-মিথ্যা টের পাওয়া যায় । খোলামেলাভাবে আন্তরিকতার সাথে তাঁকে বলুন
যেন সন্দেহের ব্যাপারটা তিনি পরিস্কার করে ব্যাখ্যা করে মন থেকে অশান্তি
দূর করে দেন ।
পরিবার
হলো সমাজ-সংগঠনের একক। অর্থাৎ এই পরিবারের সমষ্টিই সমাজ । ফলে সামাজিক
শৃঙ্খলা ও শান্তির মূল উৎসভূমিই হলো পরিবার। সেই পরিবারটি যদি সুশৃঙ্খল না
থাকে, তাহলে সমাজও শৃঙ্খলাহীনতায় ভোগে। তাই সবার আগে প্রয়োজন নিজ নিজ
পরিবারে সুস্থ ও শান্তিময় পরিবেশ গড়ে তোলা। এই পরিবেশ সৃষ্টির প্রধান
দায়িত্ব যাদের, তারা হলেন বাবা-মা।
স্বামী এবং স্ত্রীর
মধ্যকার সুসম্পর্কের মূল ভিত্তিই হলো পরস্পরের প্রতি গভীর আস্থা ও
বিশ্বাস। ফলে বিশ্বাস বা আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়, এমন কোন কাজই করা ঠিক নয়।
মানুষ মাত্রই কৌতুহলী, তবে স্ত্রীদেরকে স্বামীদের ব্যাপারে কৌতুহলী হতে
একটু বেশী দেখা যায়। স্ত্রীদের অনেকেই তাদের স্বামীর পেশা, বেতন, অফিসের
প্রাত্যহিকতা ইত্যাদি ব্যাপারে জানতে চায়। কোন কোন স্বামী যে বলেন না-তা
কিন্তু নয়।
আসলে স্বামীরা সাধারণত স্ত্রীদের সাথে তাদের যে কোন গোপনীয়
ব্যাপারে আলাপ করতে দ্বিধা করেন না। কিন্তু সমস্যা হলো অনেকেই মনে করেন
যে, স্ত্রীদের কাছে কোন কথাই গোপন থাকে না। অন্যদের সাথে গল্পচ্ছলে তারা
সবই প্রকাশ করে দেন। কথাটা অবশ্য পুরোপুরি যে মিথ্যে, তাও নয়। বরং এর
সত্যতা ভয়াবহ। ভয়াবহ এ জন্যে যে, স্বামীর গোপনীয় বিষয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার
কারণে অনেকেরই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এ ধরণের পরিণতির কারণে যে
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আস্থাশীলতার অমর্যাদা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এমনকি
অনেক স্ত্রী আবার স্বামীর এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেইল
পর্যন্ত করে বসে। স্ত্রীরা যে এ ধরনের কাজ ইচ্ছাকৃতই করেন, তা কিন্তু নয়।
বরং স্ত্রী জাতির স্বভাবটাই হলো আবেগপ্রবণ। তাই এই আবেগপ্রবণতার কারণে
নিজেকে সবসময় ধরে রাখতে পারেন না।
নারী মাত্রই অনিয়ন্ত্রিত আবেগের
অধিকারী। কিন্তু ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। আবার কোন কোন
স্ত্রী ইচ্ছাকৃতই যেন স্বামীর গোপনীয় বিষয়গুলোকে তার বিরুদ্ধে সময় মতো
কাজে লাগান। অবশ্য এর পরিণতি যে আত্মবিধ্বংসী, তা ঘটনা ঘটানোর সময় আবেগের
কারণে বুঝে উঠতে পারেন না। অথচ ঘটে যাওয়ার পর অনুশোচনা করেও লাভ নেই। কারণ
ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কোন পথ আর তখন অবশিষ্ট থাকে না।
এই বক্তব্য কতোটা
বাস্তব, তা যারা এরই মধ্যে এ ধরনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন, তারাই ভালো বলতে
পারবেন। এই সব অভিজ্ঞতার নিরিখে কেউ যদি মনে করেন যে, বিপদ বা সমস্যার
আশঙ্কায় আত্মসংযমী হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত তাহলে কি ভুল হবে? এখানে আত্মসংযমী
বলতে বোঝানো হচ্ছে, স্ত্রীর সাথে গোপনীয় সকল বিষয়ে একটু ভেবে-চিন্তে
আলাপ-আলোচনা বা গল্প-গুজব করা। তবে হ্যাঁ! যদি স্ত্রী যথেষ্ট বিচক্ষণ হন,
দূরদর্শী হন এবং স্বামী-সংসারের মঙ্গল-অমঙ্গল চিন্তায় ইতিবাচক হন, তাহলে
ভিন্ন কথা। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিমতীরা কখনো তাদের গোপনীয় কথা
দ্বিতীয় কাউকে জানতে দেয় না।
ইমাম আলী (আঃ) যেমনটি বলেছেন, বুদ্ধিমান
ব্যক্তির মধ্যেই তার গোপনীয় বিষয় সবচেয়ে নিরাপদে রক্ষিত থাকে।
এতক্ষণ
পর্যন্ত যে কথাগুলো উল্লেখ করা হলো, তার মূল উদ্দেশ্য হলো একথা বোঝানো যে,
স্বামীরা যদি তাদের স্ত্রীদেরকে কোন গোপনীয় বিষয় জানাতে না চান, তাহলে তা
নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। এখানে আস্থা বা বিশ্বাসহীনতার কোন প্রসঙ্গ
নেই। সমাজ বলুন, রাষ্ট্র বলুন আর কল-কারখানা বলুন একটু মনযোগ দিলেই দেখবেন
যে সেখানে রয়েছে নেতৃত্ব ও আনুগত্যের একটা অমোঘ শৃঙ্খলা।
এই শৃঙ্খলা না
থাকলে কোন প্রতিষ্ঠানই সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না। একটু আগেই আমরা বলেছি যে,
পরিবার হচ্ছে সমাজ সংগঠনের একক। ফলে এই পরিবারেও থাকা চাই নেতৃত্ব এবং
আনুগত্যের ভারসাম্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সংসারের নেতৃত্বের
ভার স্বামী অথবা স্ত্রী যে কোন একজনের ওপর ন্যস্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
সে ক্ষেত্রে ইসলাম স্বামীকেই এই নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পন করেছে। এই বিধান
যে যথার্থ তা নিরপে মানসিকতা নিয়ে ভাবলেই পরিস্কার হয়ে যাবে।
বলাবাহুল্য
এর ব্যতিক্রম যেসব সংসারে রয়েছে অর্থাৎ যেখানে স্বামীর পরিবর্তে স্ত্রীই
সংসারের কর্ত্রী, সেখানে শৃঙ্খলার নেপথ্যে কতো যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে তা
ভুক্তভোগী মাত্রই বুঝতে পারেন। সকল সত্য সবসময় প্রকাশিত হয় না। বাংলায়
একটি প্রবাদ আছে ‘বাতির নীচে অন্ধকার'-এই প্রবাদটি এ ধরণের পরিস্থিতিতে
বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়।
মধ্যযুগীয় একটি কবিতার লাইন হলো' "কপালের
লিখন, না যায় খন্ডন"। অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকদীরে যা লিখে
রেখেছেন, তা ফলতে বাধ্য। আর কার তকদীরে যে কী লেখা আছে, তা তো কারো জানা
নেই। আজ যে রাজা কালই সে প্রজা, আজ যে ধনী কালই যে সে ফকীরে পরিণত হবে
না-তার কী নিশ্চয়তা আছে!
অতএব মানব জীবনটাই হলো উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখময়।
এখন কারো স্বামীর যদি হঠাৎ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায়, ধনী থেকে নিঃস্বতে
পরিণত হয়ে যায়-তখন স্ত্রী কি তাকে ভৎর্সনা করে চলে যাবে ? না, তা হবে
অমানবিক এবং হীন স্বার্থপরতা। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বন্ধন হওয়া চায়
এতো বেশী দৃঢ়, যেন স্বচ্ছলতায়, সুস্থতায়-অসুস্থতায়,
সুসময়-দুঃসময়-সর্বাবস্থাতেই সমানভাবে অটুট থাকে।
স্বামী যদি অসুস্থ হয়ে
পড়েন, তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য হলো তার সেবা-যত্ন করা, তার সুস্থতার জন্যে
সব ধরণের চেষ্টা চালানো। স্ত্রীর হাতে যদি নিজস্ব কিছু অর্থ থাকে তাহলে
প্রয়োজনে তা স্বামীর চিকিৎসায় ব্যয় করা উচিত। স্বামীরও উচিত ঠিক তেমনি
আচরণ স্ত্রীর সাথে করা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, "নারীর জন্যে জিহাদ হলো তার
স্বামীর সেবা-যত্ন করা।"
স্বামীর
সেবাকে আল্লাহর রাসূল জিহাদরূপে আখ্যায়িত করেছেন। অতএব আল্লাহর সন্তুষ্টির
জন্যে, আপনার নিজস্ব সম্মান ও মর্যাদার জন্যে,সন্তানদের জন্যে নিজেকে
বিলিয়ে দিন, আত্মত্যাগ করুন, ধৈর্য্য ধরুন, সন্তানদেরকেও ধৈর্য্য, ত্যাগ
এবং ভালোবাসার শিক্ষা দিন। নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে ইহলোক-পরলোক উভয়লোকেই
পুরস্কৃত করবেন।
পৃথিবীতে
সুহৃদের সংখ্যা খুবই কম। মানুষ অনেক সময় শুভার্থী সাজে বটে, তবে ঐ শুভ
কামনার পেছনে থেকে যেতে পারে সুদূর প্রসারী কোন অমঙ্গল। বিশেষ করে
পারিবারিক সুখ প্রতিবেশী বা নিকটজনদের অনেক সময় সহ্য হয় না। তাই যে কোন
উপায়ে ঐ সুখ নষ্ট করে দেয়ার চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকে তারা। তবে সকল
প্রতিবেশী বা স্বজনই যে এ রকম তা কিন্তু নয়। তাই স্বজনকে চেনার জন্যে,
প্রকৃত হিতৈষীকে বোঝার জন্যে যাচাই করে নেয়া উচিত।
এই যাচাইয়ের কাজ সময়
নিয়ে ধীরে ধীরে বুঝে উঠতে হবে যাতে প্রতিবেশী ব্যাপারটা টের পেয়ে মনে কষ্ট
না পায়। এ কথা বলার মানে এই নয় যে, মানুষকে সব সময় সন্দেহ করতে হবে বরং
মানুষ যাতে আপনার এবং পরিবারের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্যেই এই সতর্কতা।
দেখা গেছে বহু পরিবার ভেঙ্গে গেছে কেবল বাইরের মানুষের কারণে।
একজন
প্রখ্যাত মনীষী বলেছেন, হিংসুক এ চিন্তাতেই শুকিয়ে যায় যে তার প্রতিবেশী
কেন এতো সুখে থাকে। তাই ক্ষতি করার সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা নিয়ে ঐ
প্রতিবেশী বন্ধু সাজার চেষ্টা করে। বন্ধুত্বের এক পর্যায়ে শুরু হয়ে যায়
আসল কাজ অর্থাৎ স্বামীর সাথে স্ত্রীর কিংবা স্ত্রীর সাথে স্বামীর দূরত্ব
সৃষ্টির অপচেষ্টা। সাধারণত মহিলারা একটা জায়গায় একত্রিত হলে বিচিত্র
গল্পের পাশাপাশি স্বামীদের নিয়েও গল্প শুরু করে দেয়।
এইসব গল্প যে সবসময়
সুখকর তা নয়। পরচর্চা আর পরনিন্দা করার অভ্যাস মহিলাদের মধ্যেই একটু বেশী
দেখা যায়। ফলে পরনিন্দা করতে করতে নিজের স্বামীরও নিন্দা শুরু করে দেয়। এর
ব্যতিক্রম যে নেই, তা কিন্তু নয়। আর দুষ্টলোকেরা এই সুযোগে পারস্পরিক
বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য হাসিল করে। কার স্বামী কেমন, কী চাকরী করে,
আর স্বামীদের কার কী খুঁত-এইসব নিয়েও তারা আলাপ করে। এমনকি একজন আরেকজনকে
গল্পচ্ছলে এমনও বলে বসে-তুই কেন অমুক পেশার লোককে বিয়ে করতে গেলি! তোর মতো
সুন্দরী মেয়ের কি আরো ভালো বর পাওয়া কঠিন ছিল? তুই চাইলেতো যে কাউকেই
বিয়ে করতে পারতি, আহা রে.....! ইত্যাদি।
এই কথাগুলো আপাত দৃষ্টিতে
সহানুভূতিশীল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে সর্বনাশের
বীজ। এইসব কথা পরোক্ষভাবেই বান্ধবীর স্বামীকেই নিন্দা করা ছাড়া আর কিছু
নয়। যে বান্ধবীকে এই কথাগুলো শোনানো হয়, তার ভেতরে কিন্তু কথাগুলো বারবার
প্রতিধ্বনিত হবে। এরপর শুরু হবে স্বামী বিদ্বেষ। পরিণতিতে পারিবারিক
বিশৃঙ্খলা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত এমনকি বিচ্ছেদও ঘটতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে
এভাবে যারা কথা বলে, তারা নারীরূপে সাক্ষাৎ শয়তান। এরা পারিবারিক জীবনের
শত্রু । রাসূল (সাঃ) এ ধরণের হীনকাজ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে বললেও
অনেকেই এই স্বভাব ছাড়তে পারেন না। মহানবী(সাঃ) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যারা
নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী কর, কিন্তু নিজেদের অন্তরে প্রকৃত বিশ্বাস
জাগ্রত করতে ব্যর্থ হয়েছ, তারা অপর কোন মুসলমান সম্পর্কে কটু কথা বলো না,
কিংবা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়িও না। যে ব্যক্তি অপরের দোষ খুঁজে বেড়ায়
আল্লাহও তার সাথে অনুরূপ আচরণ করবেন। ফলে সে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হবে,
নিজেকে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রেখেও সে আত্মরক্ষা করতে পারবে না।"
অনেক
আত্মীয়-স্বজন আবার আপনজনের মতো তাদের মেয়েদের এমনসব পরামর্শ দেয়, যা
স্বামীর সংসারে মেয়ের টিকে থাকাটাকেই সংশয়িত করে তোলে। আর মেয়েও তার
আত্মীয়-স্বজনদের কথা চোখবুঁজে মেনে নিতে চায়। কারণ তাদের সে একান্ত আপন মনে
করে। কিন্তু এই ধারণাটা একদম ঠিক নয় । কারণ বিয়ের পর মেয়েদের সবচেয়ে
আপনজন হলো তাদের স্বামী। মনে রাখতে হবে আপনজনদের নাক গলানোর কারণেও বহু
মেয়ের সংসার ভেঙ্গে গেছে।
এ সম্পর্কে আসলে মহানবীর দিক-নির্দেশনাটিই সবচে'
কার্যকরী। তিনি বলেছেন, "তোমাদের নারীদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে অনেক
সন্তানের জন্মদাত্রী, স্নেহময়ী ও পূত-পবিত্র, যে নিজের আত্মীয়-স্বজনের
ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন না করে বরং স্বামীর প্রতিই অনুগত থাকে,
স্বামীর জন্যেই কেবল সাজ-সজ্জা করে এবং অপরিচিতদের থেকে নিজেকে দূরে রাখে,
স্বামীর কথা মন দিয়ে শোনে ও মান্য করে, একান্তে স্বামীর ইচ্ছার বশবর্তী হয়
এবং কোন অবস্থাতেই নিজের শালীনতা ক্ষুন্ন হতে দেয় না।"
হাদীস
শরীফে সাজ-সজ্জার কথা এবং শালীনতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এ দুটি বিষয়
সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে কেবল বাইরে যাবার জন্যেই সাজগোজ করে, কিন্তু
বাসায় সেজেগুজে থাকে না, এটা কিন্তু ঠিক নয়। বাসাতেই বরং সবসময় সেজেগুজে
থাকা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে-স্বামীরা সব সময়ই তাদের স্ত্রীদের সুন্দরী ও
স্মার্ট হিসেবে দেখতে চায়। এ কথাটি সবাই হয়তো প্রকাশ নাও করতে পারে, তবে
মনে মনে সব স্বামীই প্রত্যাশা করে। আরেকটি বিষয় হলো পরিচ্ছন্ন ঘরে যদি আপন
স্ত্রীকে সাজ-সজ্জারত পায়, তাহলে স্বামীদের দৃষ্টি বাইরে না গিয়ে ঘরের
দিকেই পড়ে এবং ঘরে ফেরার জন্যে তারা উদগ্রীব হয়ে থাকে-যা প্রত্যেক
স্ত্রীরই একান্ত প্রত্যাশা।
শালীনতা
একটা বিচিত্রমাত্রিক শব্দ। সর্বক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ যথার্থ। কথাবার্তা,
চলাফেরা, আচার-আচরণ, পোষাক-আশাক, নাওয়া-খাওয়া ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই
শালীনতা একটা মস্ত ব্যাপার। আপনার স্বামী কোন কারণে হয়তো রেগে গেল, আপনি
কি তখন গোমরামুখো হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন ? না এখানে শালীনতা হলো আপনি
স্বাভাবিক থাকুন এবং প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বরং রাগ কমানোর আন্তরিক কৌশল
ব্যবহার করুন। পরিস্থিতি অনুকূল হয়ে আসলে রাগের কারণ কিংবা সঙ্গত-অসঙ্গত
বিষয়ে ধীরে-সুস্থে কথা বলুন। এরই নাম শালীনতা। প্রত্যেকটি ব্যাপারে এভাবে
ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করাই হলো শালীনতা। এই শালীনতা যে কেবল
ধৈর্যেরই পরিচায়ক তা নয় বরং আপনার এই ভূমিকা আপনাকে করে তুলবে আরো বেশী
ব্যক্তিত্বময়ী ও মহীয়সী।
সোনালী
নীড়ের এবারের পর্বে আমরা একটি পরিবারে স্ত্রীর যে স্বাভাবিক দায়িত্বগুলো
রয়েছে, যেমন ঘরকন্না, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, অতিথি-আপ্যায়ন ইত্যাদি-এসবের
ব্যাপারে ইসলামের দিক-নির্দেশনা তুলে ধরবো।
"পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা
ঈমানের একটি অঙ্গ "-এ ধরণের একটি হাদীসের সাথে আমরা সবাই মোটামুটি
পরিচিত। এ সংক্রান্ত আরেকটি হাদীস এরকম-রাসূলে কারীম (সাঃ) বলেছেন, ইসলাম
যেহেতু শুদ্ধ-পবিত্র, তাই তোমাদের উচিত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে
চেষ্টা করা। কারণ একমাত্র পরিস্কার-পরিচ্ছন্নরাই বেহেশতে প্রবেশ করার
অনুমতি পাবে।
যে কোন
সচেতন মানুষই জানেন যে, ময়লা-আবর্জনা হলো রোগ জীবানুর স্বর্গরাজ্য, সে
ময়লা আপনার ঘরেই হোক আর বাইরেও হোক-একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ফলে ঘরে ময়লা
হলে তাকে যদি জমিয়ে রাখা হয়, তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে রোগ-জীবানু ছড়াবে।
তাই যত দ্রুত সম্ভব ঘরের ময়লা-আবর্জনা দূর করে ঘর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা
উচিত। আজকাল শিক্ষিত গৃহিনীদের কেউ কেউ ঘর পরিস্কারের কাজকে খাটো করে
দেখতে চায়।
এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করা একদম ঠিক নয়। বরং শিক্ষিতদের চিন্তা
করা উচিত, যারা অশিক্ষিত-তারা শিক্ষিতদের কাছ থেকে শিখবে। তাই শিক্ষিত
নারীর উচিত তাদের ঘরকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা। তাহলে সমাজের জন্যে
একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে যে, শিক্ষা নারীকে সুগৃহিনী হয়ে উঠতে
সহায়তা করে। ঘর-সংসারের দেখা-শোনার কাজ করে শিক্ষিত নারী গর্বিত বোধ করতে
পারে এবং প্রমাণ করে দিতে পারে যে, শিক্ষিত একজন গৃহবধূ অশিক্ষিত একজন
গৃহবধূর চেয়ে অনেক শ্রেয়।
ঘরকন্নার
কাজ নারীদের একটা অলিখিত দায়িত্ব। এই দায়িত্বের মধ্যে
পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, রান্নাবাড়া, সন্তান প্রতিপালন অন্তর্ভূক্ত। হযরত আলী
(আঃ)এর একটি উক্তি হলো, "তোমাদের ঘর থেকে মাকড়শার জাল পরিস্কার করে
ফেলবে, কেননা মাকড়শার জাল হলো দারিদ্রের কারণস্বরূপ।" তাঁর এই বক্তব্য
থেকেই বোঝা যায় যে, ঘর-দোর প্রতিদিন পরিস্কার করতে হবে। কারণ মাকড়শা খুব
অল্প সময়ের মধ্যেই জাল বোণে। দৈনন্দিন খাওয়া-দাওয়ার পর বাসন-কোসন,
হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে সকল নোংরা তৈজস ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে রাখা
উচিত।
অবশ্য সময়-সুযোগ মতো স্বামীদেরও উচিত এসব কাজে স্ত্রীকে সাধ্যমতো
সহযোগিতা করা। রান্নাবান্না যেহেতু মেয়েরাই সাধারণত করে থাকে, তাই
পরিস্কারের স্বাস্থ্য সুরার সুমহান দায়িত্বটি তাঁদের হাতেই বর্তায়। এ
ব্যাপারে নারীরা যদি অবহেলা বা অমনযোগ দেখান, তাহলে পরিবারের সকল সদস্যই
অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই নারীদেরকে খাদ্যের পুষ্টিগুণ
সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরী।
শিক্ষিত নারীরাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখতে পারেন। তাছাড়া যে সৌভাগ্যবান স্বামীর স্ত্রী ভালো রান্না
করতে জানেন, তিনি কি স্ত্রীর হাতের সুস্বাদু রান্না ফেলে রেখে বাইরে খেতে
যাওয়ার মতো বেরসিকের পরিচয় দেবেন ? মহানবী(সাঃ) বলেছেন, তোমাদের নারীদের
মধ্যে সেই সবচেয়ে সেরা, যে নিজেকে সুগন্ধে সুরভিত করে, দক্ষতার সাথে খাবার
তৈরী করে এবং অতিরিক্ত ব্যয় করে না।
রাসূলে কারীম (সাঃ)ও আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ-খবর রাখা, তাদের বিপদ-আপদে সহযোগিতা করার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। মেহমানদারী বা অতিথি আপ্যায়ন এভাবেই মুসলমানদের একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আর এই অতিথি আপ্যায়নের ব্যাপারটি প্রধানত গৃহকর্ত্রী অর্থাৎ স্ত্রীর ওপরই নির্ভর করে।
নিঃসন্দেহে অতিথির আগমণ একটি পরিবারে আনন্দ বয়ে আনে। রাসূলে কারীম (সাঃ) বলেছেন, "অতিথির খাবার আল্লাহই বরাদ্দ করে থাকেন, আর সেই বরাদ্দ যখন অতিথি ভোগ করে তখন গৃহস্থের গুণাহ মাফ হয়ে যায়। ফলে সাময়িক এবং পরকালীন দু'ধরণের আনন্দই বয়ে নিয়ে আসে অতিথি। এছাড়া বন্ধু-বান্ধব বা অতিথি সমাবেশে এসে মানুষ অল্প সময়ের জন্যে হলেও ভুলে যেতে পারে ব্যক্তিগত বিষন্নতা বা টেনশন। আপনাদের সান্নিধ্য এতো উপকারী এবং প্রিয় হবার পরও বহু গৃহিনী আছেন, যারা অতিথি পরায়নতা পছন্দ করেন না।
এর অবশ্য কিছু কারণ আছে। প্রথমতঃ ঘরের আসবাবপত্র ও তৈজস সামগ্রীর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা। যদিও এ বিষয়টি একেবারেই নগণ্য একটি বিষয়। ঘরের আসবাবপত্র প্রয়োজনীয় জিনিস। কিন্তু এসবের ক্ষেত্রে সম্পদশালীরা এক ধরণের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করায় বিষয়টা এক রকম ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যে বোনেরা এ ব্যাপারে হীনমণ্যতায় ভোগেন, তাদের বলবো আপনারা রাসূলের প্রতি ভালোবাসার দিকটিকে গুরুত্ব দিয়ে তথাকথিত ফ্যাশনের ব্যাপারটি ভুলে যাবার চেষ্টা করুন।
দ্বিতীয় কারণটি হলো মেহমানদারী করাটাকে আর্থিক ক্ষতি এবং শ্রমসাধ্য ব্যাপার মনে করে বিরক্তিবোধ করেন। এ দুটির কোনটিই উচিত নয়। আপনার কিংবা আপনার স্বামীর বন্ধু-বান্ধব থাকতে পারে। তাদের বাসায় যেমন বেড়াতে যাওয়া উচিত, তেমনি তাদেরকেও আপনার বাসায় আমন্ত্রণ জানানো উচিত। কোনভাবেই বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত করলে বিরক্তিবোধ করা ঠিক নয়।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আলাপ আলোচনার করে দাওয়াতের বিষয়গুলো ঠিক করবেন। বাজার করা, রান্নাবাড়া করা ইত্যাদি সকল কাজে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে করুন। ফলে অতিথির আগমণ আপনাদের পরিবারে আনন্দ বয়ে আনবে। পক্ষান্তরে পলিত হবে মহানবীর একটি অন্যতম সুন্নত।